প্রিন্ট এর তারিখঃ Jan 15, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jan 11, 2026 ইং
বন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মধুপুরে মামলা থেকে খালাস ৩৮৭ আসামী ॥ সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি

জয়নাল আবেদীন
লাটু নকরেক পিতামৃত সমিলা মাংসাং। বাড়ি মধুপুর বনাঞ্চলের বেড়িবাইদ গ্রামে। পেশায় দিনমজুর । আনারস আর কলা বাগানে দিন মজুরি করে সংসার চালায়। জবরদখল হওয়া বনভূমির কলা বাগানে দিনমজুর হিসাবে কাজ করতে গিয়ে ২০১৭ সালে প্রথম বন মামলার আসামী হন। এরপর ২০২১ পর্যন্ত আরো ১২টি মামলা হয়। মামলায় দুই বার জেল হাজতে যেতে হয়। গত বুধবার টাঙ্গাইল বন আদালত মধুপুর বনাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির গারো ও কোচ সম্প্রদায় এবং বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে চলমান ৮৮টি বন মামলা খারিজ করে দেয়। এসব মামলায় আসামী ছিল ৩৮৭ জন। এর মধ্যে লিটু চার মামলা থেকে খালাস পান। কিন্তু বিচারাধীন অপর ৯ মামলা থেকে আদৌ খালাস পাবেন কিনা জানেনা তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন। তিনি এসব হয়রানি মূলক মামলা খারিজ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন অফিস এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মধুপুর শালবনে বসবাসকারি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের প্রথাগত ঐতিহ্য ও অধিকার সংরক্ষণের জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ৪ ডিসেম্বর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এসব বন মামলা প্রত্যাহারের জন্য সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক বন আদালতের বিজ্ঞ সিনিয়র জ্যুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট গত বুধবার মামলার শুনানী গ্রহন করেন। দায়িত্বরত বন মামলার পরিচালক শুনানিকালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বিজ্ঞ আদালতের নজরে আনেন। বিজ্ঞ বন আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে ৮৮টি বন মামলা প্রত্যাহার করেন। এতে অভিযুক্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ২৩১জন এবং স্থানীয় বাঙ্গালী ১৫৬সহ মোট ৩৮৭ জন মামলা থেকে খালাস পান। এসব মামলা থেকে প্রত্যাহার বা খালাসের ফলে মধুপুর জঙ্গলে বসবাসরত প্রথাগত বন বাসিদের মাধ্যমে শালবন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম অধিকতর সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মামলা খালাসের কাগজপত্র ঘেটে দেখা যায়, আসামীদের ২৭৩ জন জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জের, ৫জন মধুপুর রেঞ্জের এবং অবশিষ্টরা দোখলা রেঞ্জের। অরনখোলা রেঞ্জে দায়ের করা বা চলমান কোন মামলা খারিজের তালিকায় ছিলনা। ফলে এ রেঞ্জেরা সব বন মামলা আদালতে চলমান থাকবে। খালাস পাওয়া আসামীদের মধ্যে ১৩জন নারী, ২জন এনজিও কর্মী এবং একজন সাংবাদ কর্মী রয়েছেন। গারো নেতা এবং জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেকও দুটি বন মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন। সংবাদকর্মী এডওয়ার্ড প্রিন্স জানান, মধুপুর রেঞ্জের জাঙ্গালিয়া এলাকায় প্রকাশ্যে গজারী বন কেটে প্লট বরাদ্দ দিয়ে বিদেশী প্রজাতির আকাশমনি গাছের বনায়ন করার খবর ঢাকার একটি দৈনিক প্রকাশ করায় সংশ্লিষ্ট বনকর্মীরা তার উপর ক্ষুব্ধ হন। তারা প্রকাশিত খবরের কোন আপত্তি বা প্রতিবাদ না দিয়ে ২০১৯ সালের ২ নভেম্বর গোপনে তার বিরুদ্ধে বন থেকে গাছ চুরির একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় দীর্ঘ দিন জেলহাজতে থাকতে হয়। টানা ৭ বছর বন আদালতের সেই মামলা চালাতে গিয়ে তিনি নিংস্ব হয়ে গেছেন।
অথচ জাঙ্গালিয়া এলাকার সেই আকাশমনি বাগান বিলীন হয়ে গেছে। প্রভাবশালীরা সেখানকার তিন শতাধিক একর বনভূমিতে আনারস আর কলা আবাদ করছে। তিনি তদন্ত সাপেক্ষে সব মিথ্যা বন মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
মামলা থেকে খালাস পাওয়া গারো নেতা ইউজিন নকরেক জানান, তারা দীর্ঘ দিন ধরে মধুপুর বনাঞ্চলে দায়ের হওয়া হয়রানিমূলক বন মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বন উপদেষ্টা সৈয়দা রোজোয়ানা হাসান গত মে মাসে ‘মধুপুর শাল বন পুনরুদ্ধার প্রকল্প উদ্ধোধনের দিন এক সমাবেশে সব হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান। তারই ধারাবাহিকতায় বন আদালতের মাধ্যমে এসব মামলা খারিজ করা হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে আরো শতাধিক বন মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সেসব মামলা ক্রমান্বয়ে খারিজ হলে বন বিভাগের সাথে স্থানীয় জনগোষ্ঠির অহিনকূল সম্পর্কের অবসান ঘটবে এবং সৌহার্দপূর্ন পরিবেশে ‘শালবন পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ সহজেই বাস্তবায়ন করা যাবে।
টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন জানান, ‘শালবন পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করার স্বার্থেই সরকার এসব বন মামলা খারিজ করার উদ্যোগ নেয়। বন অপরাধ যাতে একদম কমে যায় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠি যেন নিজের উদ্যোগে বন রক্ষায় এগিয়ে আসে- তেমনটাই প্রত্যাশা সরকারের।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃdailyprogotiralo.com