প্রিন্ট এর তারিখঃ Feb 21, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Feb 21, 2026 ইং
অমর একুশে শোক, শক্তি ও গৌরবের প্রতীক

মহান একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে শোক, শক্তি ও গৌরবের প্রতীক। ১৯৫২ সালের এ দিনে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিকসহ আরও অনেকে। শোকাবহ এ দিনের স্মরণে আজ তাই সব পথ মিলে গেছে শহীদ বেদিতে। শুধু কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নয়, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছড়ি থাকা সব শহীদ মিনারে ফুলেল ভালোবাসা জানিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে ভাষা শহীদদের। একুশ বাঙালির চেতনায় সদা জাগ্রত। এক অর্থে একুশ মানেই বাংলাদেশ। একুশ মানেই আমাদের স্বাধীনতা, স্বকীয়তা, মায়ের ভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার, আমাদের নিজস্ব স্বত্তা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য মূর্ত প্রতীক। একুশ মানেই সামনে এগিয়ে
যাওয়া-একুশ মানেই মাথা নত না করা। একুশ মানেই বাঙালির গৌরব-একুশ মানেই বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সংগ্রামের রক্তাক্ত কেন্দ্রবিন্দু। অমর একুশের শহীদের রক্তাক্ত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামের রক্তাক্ত পথযাত্রা শুরু হয়। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির ওপর 'অপারেশন সার্চ লাইট' নামের যে বর্বর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে-সেদিন তারা একুশের স্মৃতি স্মৃতিবিজড়িত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ওপর কামান দাগিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেয়-কারণ পাকিস্তানি জেনারেলরা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বাঙালির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মানেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ! ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট তথাকথিত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর '৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা 'কায়েদে আজম' মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর-'উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র' রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার বিরুদ্ধে বাঙালি ছাত্রদের 'নো' 'নো' ধ্বানি উচ্চারণের মধ্যদিয়ে শুরু হয় বাঙালির প্রথম প্রতিবাদ-এরপর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং তৎকালীন প্রাদেশিক চিফ মিনিস্টার নাজিমুদ্দিন আহমেদের সঙ্গে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চুক্তির মাধ্যমে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করার নীতিগক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জীন্নাহর মৃত্যুর পর সেই খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের ওয়াজিরে আজম (প্রধানমন্ত্রী) হওয়ার পর ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানের এক জনসভায় আবার ঘোষণা করেন-'উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।' নাজিমুদ্দিন তার ভাষণে বলেন, পাকিস্তানের জাতীয় ঐক্য ও সংহতির জন্যই উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে ১৯৪৮ সালের করা চুক্তি ভঙ্গ করে নাজিমুদ্দিনের এই একতরফা ঘোষণার বিরুদ্ধে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি গঠিত হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সমগ্র পূর্ব বাংলায় হরতাল ও সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে। ১৯৫২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং অল পার্টি কমিটি অব অ্যাকশন' 'আপসু'র মাধ্যমে '৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগ সরকারের ১৪৪ ধারা ভেঙে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক হরতাল ও সাধারণ ধর্মঘটের কর্মসূচিতে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। আসলে একুশে ফেব্রুয়ারি মানেই বাংলাদেশ-একুশে ফেব্রুয়ারি মানেই আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক এবং মানুষের ওপর মানুষের ভাষাগত নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে একটি শোষণহীন সমাজব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠা। '৫২ থেকে '৭১ বাঙালির সব রক্তাক্ত আন্দোলন-সংগ্রামের মূল পটভূমির জন্মধাত্রী ২১ ফেব্রুয়ারি।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃdailyprogotiralo.com