প্রিন্ট এর তারিখঃ Mar 26, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Mar 26, 2026 ইং
বাঙালির গৌরবময় স্বাধীনতা দিবস আজ

১৯৭১ সালে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিশ্বের ইতিহাসের একটি বিরল ও অনন্য-অসামান্য ঘটনা। মাত্র ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের ঘটনা যেমন খুঁজে পাওয়া দুস্কর-তেমনি ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ ও ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রম হারানোর এ ঘটনাও পৃথিবীতে নজিরবিহীন বটে। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির মহান বিজয়ের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতা চেঙ্গীস খান, হালাকু খান আর নাদির শাহের মধ্যযুগীয় নৃশংসতা ও বর্বরতাকেও হার মানিয়েছিল। তবে বাংলা, বাঙালির এই স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে বাংলা ও বাঙালির দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস-এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তানি শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দীর্ঘ গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে তথাকথিত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভ্রান্ত নীতির আলোকে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে বাঙালির অধিকার ও ন্যায়সঙ্গত দাবি-দাওয়া প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কারণে '৫০-এর দশক থেকেই বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রাধিকার প্রতিষ্ঠারসংগ্রাম দানা বেঁধে উঠতে থাকে।
মুসলিম লীগের মধ্যেকার চরম দক্ষিণপন্থি ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থার নেতাদের রাজনীতির যে ধারা '৪০-এর দশক থেকে প্রবহমান হয়ে আসছিল-তাই চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রাধিকার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দিয়ে ১৯৫৫ সালে গঠিত দেশের প্রথম অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগই বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রাধিকার, স্বতন্ত্র্য জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু করে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা 'কায়েদে আজম' মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঢাকায় এসে ঘোষণা করেন-'উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা-তখন এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে বাঙালির ছাত্র-শ্রমিক-জনতা। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার, শফিকের আত্মত্যাগ বাংলা ও বাঙালির জাতীয় চেতনার উন্মেষের এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। '৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদদের আত্মত্যাগের পথ ধরে '৫৪-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট হক-ভাসানী, সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগের কবর রচনা করে। এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসক চক্র ও পশ্চিম পাকিস্তানি কায়েমি শাসক গোষ্ঠী '৯২-এর (ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। '৫২-এর অমর একুশে ফেব্রুয়ারির মহান শহীদদের পথ ধরে বাঙালির স্বাধিকার, স্বায়ত্ত-শাসন ও পৃথক জাতি সত্তা প্রতিষ্ঠার আকাংখা তীব্র থেকে তীব্র হয়ে ওঠে এবং ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক জাতীয় সম্মেলনে মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠি যদি বাঙালির ওপর শোষণ, অন্যায়, অনাচার, নির্যাতন বন্ধ না করে-তাহলে বাঙালিরা পাকিস্তানকে অচিরেই 'আসসালামু আলাইকুম' বলতে বাধ্য হবে-অর্থাৎ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে বাধ্য হওয়ার প্রতীকি ঘোষণা প্রথম সে সময়ই উচ্চারিত হয়। কাগমারী সম্মেলনে পাকিস্তানকে 'আসসালামু আলাইকুম' জানানোর সেই দৃঢ়চেতা প্রত্যয়ের পথ ধরে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আন্দোলনকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যেতে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, '৬৬-এর বাঙালির ম্যাগনাকার্টা ৬ দফার আন্দোলন এবং '৬৮-'৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান বিভিন্ন মাইল ফলক। '৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি একক ম্যান্ডেট প্রদর্শন করে যে রায় দেয়-তাই বাঙালিকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পথে ধাবিত করে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃdailyprogotiralo.com