প্রিন্ট এর তারিখঃ Apr 7, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Apr 7, 2026 ইং
কর্মস্থল খাগড়াছড়িতে ॥ চিকিৎসা সেবা দেন টাঙ্গাইলের ক্লিনিকে ক্লিনিকে

কর্মস্থল খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হলেও নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন টাঙ্গাইলের ক্লিনিকে-ক্লিনিকে। সিজারিয়ান অপারেশন থেকে শুরু করে সকল জটিল কঠিন অপারেশনে এনেস্থেসিয়ালিস্টের (অজ্ঞানের) দায়িত্ব পালন করে থাকেন তিনি। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে টাকার নেশায় ছুটে বেড়ানো এই চিকিৎসকের নাম মো. তারেকুল ইসলাম তারেক। তার অনুপস্থিতির কারণে গাইনি বিশেষজ্ঞ থাকার পরও সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
পানছাড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অনুতোষ চাকমা ডা. তারেকের দায়িত্ব অবহেলার কথা স্বীকার করেছেন।জানা যায়, ডা. মো. তারিকুল ইসলাম তারেক খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জুনিয়র কনসালটেন্ট (এনেস্থেসিয়া) হিসেবে যোগদান করেন ২০২৫ সালের শুরুর দিকে। তারপর থেকেই তিনি নানা অজুহাতে অনুপস্থিত রয়েছেন। পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনেস্থেসিয়ালিস্ট যোগদান করায় কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকতর সেবা নিশ্চিত করার জন্য গাইনী বিশেষজ্ঞের চাহিদা দেন। পরবর্তীতে পানছড়িতে গাইনি বিশেষজ্ঞ পদায়ন করা হয়। এনেস্থেসিয়ালিস্ট ডা. তারিকুল ইসলাম তারেকের অনুপস্থিতির কারণে এখনো সিজারিয়ান অপারেশনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সেবা নিয়মিত চালু করা সম্ভব হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডা. তারিকুল ইসলাম তারেকের পূর্বের কর্মস্থল ছিল টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে তিনি কাজ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিকে এনেস্থেসিয়ার দায়িত্ব পালন করতেন। বিষয়টি চরম পর্যায়ে পৌঁছলে কর্তৃপক্ষ তাকে মধুপুর থেকে খাগড়াছড়ির পানছড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিনিয়র কনসালটেন্ট এনেস্থেসিয়ালিস্ট হিসেবে বদলি করেন। সেখানে যোগদান করেই তিনি প্রথমে বদলীজনিত ছুটির অজুহাতে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। এরপর থেকেই তিনি পানছড়ি থেকে মধুপুর এসে নিয়মিত বিভিন্ন ক্লিনিকের সিজারিয়ান অপারেশনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাশাপাশি অজ্ঞানের ডাক্তার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলার বেসরকারি চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধিকাংশ ক্লিনিকেই তিনি প্রতিদিন বিভিন্ন অপারেশন চলাকালে রোগী অজ্ঞানের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার দম ফেলার সময় থাকেনা তার। এক ক্লিনিক থেকে আরেক ক্লিনিকে ছুটেন আর অজ্ঞান করে চলে যান আরেক ক্লিনিকে। অনেক সময়ই অপারেশন শেষ হওয়ার আগেই অপারেশনরত চিকিৎসক ও ক্লিনিক মালিকদের বলে ছুটে যান আরেক ক্লিনিকে। ওটি রুম থেকে বের হয়েই এক হাজার পাঁচশ টাকা ক্লিনিকের ম্যানাজারদের নিকট থেকে বুঝে নিয়ে ছুটে চলেন আরেক ওটির দিকে। এভাবেই সকাল ১০টা থেকে রাত ১২-১টা পর্যন্ত চলে তার ব্যস্ততা। সপ্তাহের অন্যদিনগুলোতেও তার ব্যস্ততার শেষ নেই।
রোববার (৫ এপ্রিল) ডিজিটাল ক্লিনিক, চৌধুরী ক্লিনিকসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে অপারেশনের অজ্ঞানের দায়িত্ব পালন করেছেন। শনিবার (৪ এপ্রিল), শুক্রবারও (৩ এপ্রিল) তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন মধুপুর ও ধনবাড়ীর ক্লিনিকে। এমনকি মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ থাকলে সেখানেও এনেস্থেসিয়ার দায়িত্ব পালনের তথ্য পাওয়া গেছে।
মধুপুরের জামালপুর রোডের ডিজিটাল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপক মনিরুজ্জামান জানান, তাদের চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রে বিভিন্ন অপারেশনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে ডা. তারেকুল ইসলাম তারেক এনেস্থেসিয়ার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। আমাদের ডিজিটাল হাসপাতালেও তিনি প্রায়ই অজ্ঞানের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তিনি আজও (সোমবার) মধুপুরেই আছেন।
চৌধুরী আউটডোর ক্লিনিকের স্বত্ত্বাধিকারী ডা. জহরলাল চৌধুরী বলেন, ডা. তারেকুল ইসলাম তারেক আমাদের ক্লিনিকে অজ্ঞানের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রোগির চাপ বেশি থাকলে অন্য এনেস্থেসিয়ালিস্টরাও দায়িত্ব পালন করেন।
এব্যাপারে ডা. তারিকুল ইসলাম তারেকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি পানছড়িতে অফিস করি। তবে অনেক দূরের পথতো। তাই মাঝে মধ্যে অনুপস্থিত থাকি। আর মধুপুরে আমার সামাজিকতাও রক্ষা করতে হয়। আপনাকে পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কারণ দর্শানো হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি কোন কারণ দর্শানোর নোটিশ পাইনি।
ডা. তারেকের দায়িত্ব অবহেলার ব্যাপারে পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অনুতোষ চাকমা বলেন, বর্তমানে আমাদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দিতে হচ্ছে। বিকেল ৫টা বাজে এখনো হাসপাতালের ইমার্জেন্সি তদারকি করছি। ২০টি চিকিৎসকের বিপরীতে মাত্র ১২/১৩জন চিকিৎসক রয়েছেন। তাদের দিয়েই সামাল দিচ্ছি। এরমধ্যে ডা. তারেকুল ইসলাম যোগদানের পর থেকেই দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করছেন। মাসে কয়েকদিন দায়িত্ব পালন করেন। নানা অজুহাতে অনুপস্থিত থাকেন। ফেব্রুয়ারি মাসে দু-একদিন অফিস করেছেন। পরে শোকজ করেছি। আজও সে অফিসে নেই। তিনি শোকজের জবাব না দিয়েই সে সিভিল সার্জনের কাছে একমাসের ছুটির আবেদন করেছেন বলে জানতে পেরেছি।
খাগড়াছড়ি জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ডা. তরিকুল ইসলামের দায়িত্ব অবহেলা রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতের কথা বলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনুপস্থিত থাকেন। আমি বিষয়টি জানার পর গতমাসে তাকে শোকজ করতে বলেছি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে। ওনি মধুপুরে বা ধনবাড়ী ক্লিনিকে ক্লিনিকে এনেস্থেসিয়ার দায়িত্ব পালন করেন এই বিষয়টি আমি এখন জানতে পারলাম। আমি এখনই পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পুনরায় শোকজ এবং বেতন বন্ধ রাখার জন্য বলবো।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃdailyprogotiralo.com