প্রিন্ট এর তারিখঃ May 19, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ May 19, 2026 ইং
সখীপুরে শঙ্কা-আতঙ্কে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৮ হাজার গ্রাহক

সাইফুল ইসলাম সানি,সখিপুর
নাজমুল ইসলাম (৪০) দীর্ঘদিন সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে চাকরি করে দেশে ফিরেছেন। প্রবাস জীবনের কষ্টার্জিত সমস্ত আয়-রোজগার জমা করেছেন ন্যাশনাল ব্যাংকের টাঙ্গাইলের সখীপুর শাখায়। কিন্তু দেড় বছর ধরে সেই টাকা উঠাতে না পেরে অসহায় ছুটাছুটি করছেন তিনি। গত রোববার বেলা ১১টার দিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের সখীপুর শাখায় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় নাজমুলের। টলমল চোখে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে ফিরে একটি টাকাও বাবার হাতে তুলে দিতে পারি নাই। এবার ব্যাংক থেকে টাকা উঠাতে না পারলে কুরবানী দিতে পারব না। এখন নিজের বাবাও আমাকে অবিশ্বাস করছেন। বাবা বলছেন- "সবার ব্যাংকে টাকা দেয়, শুধু তোমার ব্যাংক দেয় না -এটা বিশ্বাসযোগ্য না। তুমি সব টাকা শ্বশুরবাড়িতে জমিয়ে রেখেছো।" এভাবে শুধু প্রবাসী নাজমুল নন, পারিবারিক ভাঙন, শঙ্কা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন শাখাটির প্রায় ৮ হাজার গ্রাহক।
উপজেলার প্রতিমা বংকী গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম এসেছেন টাকা তুলতে। তিনি জানান, মাঠে পাকা ধান, কিন্তু টাকার অভাবে শ্রমিক নিতে পারছেন না। টাকা তুলতে না পারলে মাঠের ধান মাঠেই পঁচে যাবে। সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না কেনো!
সরেজমিনে গত রোববার ও সোমবার ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের সখীপুর শাখায় গিয়ে দেখা গেছে, এ শাখায় প্রায় ৮ হাজার গ্রাহকের প্রায় ২০০ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। ঈদুল আযহার আগে গ্রাহকেরা টাকা উত্তোলনের আশায় নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। কেউ একটু আশ্বাসের আশায় পরিচিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন, আবার কেউ কেউ তর্ক জুড়ে দিয়েছেন কর্মকর্তাদের সঙ্গে। কিন্তু কর্মকর্তারা নির্বাক বসে অলস সময় পার করছেন। এ ছাড়া ব্যাংকটির রিয়েল-টাইম গ্রোস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) ও ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারসহ (ইএফটি) অনলাইনে সব ধরনের লেনদেন বন্ধ থাকার পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিং ও এটিএম বুথেও টাকা দেওয়া বন্ধ রয়েছে। ফলে গ্রাহকদের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রায় দুই বছরেও ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক না হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড সখীপুর শাখার ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ সালেক আহমেদ বলেন, ব্যাংকের নগদ টাকা সংকটের কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। এটি শুধু সখীপুরে নয়, দেশের সব শাখারই একই সমস্যা। গ্রাহকদের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে সালেক আহমেদ আরও বলেন, প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের যৌক্তিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা ছাড়া আমাদের এ অবস্থান থেকে উদ্ভূত এ পরিস্থিতির সমাধান দেওয়া সম্ভব না। তবে যতদূর জানতে পেরেছি, এবার বাজেটের পরপরই এ বিষয়ে একটি সমাধান আসতে পারে।
উল্লেখ্য, অব্যাহত অনিয়ম ও বিধি ভঙ্গের কারণে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময় পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক ঋণ নিয়মাচার ও বিধিবিধান লঙ্ঘন করে ঋণ অনুমোদন, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, পর্ষদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যাংকের শেয়ার একই পরিবারে কেন্দ্রীভূত করা, পরিচালক নির্বাচন বা পুনঃর্নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি, পর্ষদের গোচরে পরিচালকগণ কর্তৃক আর্থিক অনিয়ম, পর্ষদের নীতি-নির্ধারণী দুর্বলতার কারণে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতিসহ আরও কিছু কারণ উল্লেখ করা হয়। পরে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ব্যাংকটির আর্থিক লেনদেন আরও লাজুক হয়ে পড়ে। বর্তমানে রেমিট্যান্স ব্যতীত সব ধরনের লেনদেন বন্ধ রয়েছে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃdailyprogotiralo.com