
ফ্যাল-ফ্যাল চোখে পুত্রের দিকে তাকান প্রিয় বাবা। তাঁর ইচ্ছে থাকলেও সন্তানকে বাঁচাতে আজ কিছুই করতে পারছেন না তিনি। কান্নাও এখন যেনো স্তব্ধ। নিজের অসুস্থ্যতা ভুলে সন্তানের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন তিনি। আর পাশেই শয্যাশায়ী বাবাকে দেখে নি:শব্দে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। মুছতে মুছতে দু’চোখের কোনায় এখন ‘ঘা’ হয়ে গেছে। তিনিও তার বাবাকে বাঁচানোর আক্ষেপ হৃদয়ে থাকলেও উপায় নেই! এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যের দেখা মিললো ময়মনসিংহের গৌরীপুরে। বাবা আবুল হাসিম (৭০) ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত আর তার বড় ছেলে দিলোয়ার হোসেন লিটন (৩৯) ক্যান্সারে আক্রান্ত। দু’জন শোয়ে আছেন পাশাপাশি। অর্থাভাবে মিলছে না চিকিৎসাও। তাদের বাড়ি উপজেলার ২নং গৌরীপুর ইউনিয়নের গাভীশিমুল গ্রামে।
সিএনজি চালিয়ে স্ত্রী, দুই ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে হাঁসিখুশিতে কাটছিলো সুখের সংসার। তেমন সঞ্চয় না থাকলেও ঋণের বোঝা ছিলো না। ঝুঁপড়ি ঘর হলেও সেখানে ছিলো আনন্দের ভুবন। বড় মেয়ে জিনিয়া আফরিন গাভীশিমুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণিতে, পুত্র জাহিদ হাসান মাহিম মাদরাসায় ২য় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ছোট পুত্র মাহমুদুল হাসান জিহাদের বয়স ৩বছর।
দিলোয়ার হোসেন লিটনের স্ত্রী জায়েদা আক্তার জানান, সৎসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিই আজ দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০২৫সনের ৫ এপ্রিল। সেই থেকে চলছে তার চিকিৎসা কার্যক্রম। এ পর্যন্ত ৭টি কেমো দেয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপী বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আমিনুল ইসলাম ও একই হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগ (ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র) এর আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম পাঠানের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে।
তিনি জানান, মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ছাড়া আর কোনো সহায়-সম্পদ নেই। ইতোমধ্যে চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় ৭লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং নিজের যা ছিলো সব শেষ করে দিয়েছি। এখন সন্তানদের মুখে তিনবেলা খাবার দিবো সেইটুকু সামর্থ্যও নেই। চিকিৎসা চালালে আরও ৪-৫ লাখ টাকা প্রয়োজন।
ছেলেকে বাঁচাতে যখন পুরো পরিবার দিক-বেদিক ছুটছে ঠিক তখনেই অসুস্থ্য হয়ে পড়েন দিলোয়ার হোসেন লিটনের বাবা আবুল হাসিম। এ মাসের ৭ তারিখে চিকিৎসকরা জানান, ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত তিনি। ছেলের ক্যান্সারের পর বাবার ব্রেইনে টিউমার শুনে স্তব্দ হয়ে পড়েন পুরো পরিবার। তিনি এক সময় দর্জি পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। কর্মের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের গৌরীপুর উপজেলা শাখার কার্যকরী সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সংগঠনের প্রত্যেক কর্মসূচী পালনে ছিলেন তিনি নিবেদিত কর্মী। এ গ্রামের নেকবর আলীর পুত্র তিনি। স্ত্রী, তিন কন্যা আর ২ পুত্র নিয়ে চলছিলো তার সংসার। তিন মেয়েই বিবাহিত। ছোট ছেলে সাখাওয়াত হোসেনও বাবার পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বাবা আর ভাইয়ের চিকিৎসা করতে গিয়ে তিনি দীর্ঘদিন যাবত কাজে যেতে পারছেন না।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি ও ২নং গৌরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. শহীদুল্লাহ জানান, হাসিম ভাই দলের দু:সময়ে প্রত্যেকটি কর্মসূচী বাস্তবায়নে সাথে ছিলো। ২০২৩ সনের ২৮ অক্টোবর ঢাকার বিএনপির মহাসমাবেশে গিয়েছিলো। রাতভর তিনি জেগে দলের পতাকা তৈরি করেছেন। তার হাতে তৈরি হয়েছে দলীয় অসংখ্য পতাকা, সেই মানুষটি আজ অসুস্থ্য।
তিনি আরও বলেন, পিতা-পুত্রের চিকিৎসার জন্য আমরা সামর্থ্যনুযায়ী সহযোগিতা করছি। সরকার, বিত্তবান মানবিক মানুষ ও রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ যদি এগিয়ে আসেন, হয়তো তাহলে বাবা-ছেলের চিকিৎসা কার্যক্রমটা চলবে। অর্থাভাবে যেনো চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ না হয়ে যায়, সেই জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।