
রইছ উদ্দিন,গৌরীপুর(ময়মনসিংহ) থেকে
‘মেঘলা আকাশ দেখলে, আতঙ্কে থাকেন ওরা’ এই বুঝি ছাল উড়িয়ে নিলো! আর আকাশ কেঁদে বৃষ্টি ছাড়লে কষ্টে কাঁদেন শিক্ষার্থীরাও। কালবৈশাখী ঝড়ে একযুগ আগে উড়িয়ে নেয়া বারান্দা আজও ঠিক হয়নি। ছাত্রাবাস থেকে সড়কে উঠার পথ নেই, জলাবদ্ধতার কারণে চলাচলেও চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। এভাবেই দুর্ভোগের মধ্যদিয়ে দিন যাচ্ছে ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী গৌরীপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের। কলেজের ৭ হাজার ৩৭৭ জন শিক্ষার্থীর মাঝে মাত্র ২৭জনের আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০জুলাই/২৬) সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ¯œাতক শিক্ষার্থীদের ২৪টি আসনের নুরুল আমিন খান ছাত্রানিবাসে ছাত্র নেই। পরিত্যক্ত ভবনে পাশ^বর্তী এলাকাবাসী গো-খাদ্য রেখেছেন। দরজাবিহীন পরিত্যক্ত আরেকটি কক্ষে নেশা জাতীয় দ্রব্য ব্যবহারের উপকরণ ও অনৈতিক কাজের চিহ্ন রয়েছে। বাথরুমের ফিটিংসও খুলে নিয়ে গেছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংস্কার ও মেরামতকৃত ভবনটি ব্যবহারের আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একপাশের দেয়ালে আগাছা-পরগাছা জন্ম নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য টিনশেডের একটি ঘর নির্মাণ হলেও সেখানে শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না।
অপরদিকে এক সময়ে এইচএসসি শিক্ষার্থীদের এসআলী ছাত্রাবাসের ২৭টি আসনেই কলেজের এখন একমাত্র ভরসা। এ ছাত্রাবাসের ডায়নিং রুমের বারান্দার ছাল উড়িয়ে নিয়ে যায় এক যুগ আগে। সেটা এখনো মেরামত হয়নি। ছাত্রবাসের গেইট ভাঙা-চোরা ফলে শিক্ষার্থীরা আছেন নিরাপত্তাহীনতায়। প্রত্যেকটি রুমের দরজা-জানালাও নড়বড়ে। ৯টি কক্ষের মধ্যে ৭টি কক্ষেই ছালের টিন ছিদ্র। এ প্রসঙ্গে অনার্স প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী সজিব খান জানান, আকাশ কাঁদলে আমরাও কেঁদে উঠতে হয়। কেননা আকাশের বৃষ্টি জমিতে পড়ার আগে আমাদের রুমে পড়ে। বিছানা, টেবিলের জিনিসপত্র ভিজে যায়। শুধু আকাশ কাঁদে না, আকাশ কাঁদলে আমরাও সেজন্য কাঁদি।
ছাত্রাবাসের আরেক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান জানায়, ডায়নিং রুমের অবস্থার অত্যন্ত খারাপ। বারান্দাটা নেই, ভিতরেও পানি পড়ে। বিশেষ করে রান্না ঘরে খালা (কাজের বুয়া) বৃষ্টিতে ভিজে রান্না করতে হয়। তিনি আরও জানায়, ছাত্রাবাসের ৪নং, ৫নং ও ৭নং কক্ষের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে আছেন। টিনের ছালের নড়বড়ে, মনে হয় কখন জানি উড়িয়ে নিয়ে যায়।
আরেক শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান জানায়, কক্ষগুলোর দরজা-জানালাগুলো নষ্ট থাকার কারণে প্রায়ই ছাত্রাবাসে স্থানীয় ছিচকে চোরের দল মোবাইল ও টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। জীবন আর মালামাল নিয়েও আতঙ্কে থাকতে হয়।
এ কলেজটিতে বর্তমানে এইচএসসিতে ছাত্র ১হাজার ৯৫জন, ছাত্রী ১হাজার ১১২জন, ¯œাতক (পাস) ছাত্র ৮৬০জন, ছাত্রী ১৪৯৮জন, অনার্স (সম্মান) ছাত্র ১হাজার ৬১১জন ও ছাত্রী ১ হাজার ২০১জন অধ্যয়নরত। কলেজের ৭ হাজার ৩৭৭জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র ২৪টি আসন ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন যাবত ২৭ আসনের নুরুল আমিন খান ছাত্রাবাস ব্যবহার অনুপযোগী। আসন সঙ্কটের কারণে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই সীটের জন্য আবেদন করেও সিট পাচ্ছে না। ফলে তাদের থাকতে হচ্ছে মেসে কিংবা ভাড়া বাসায়। এতে করে তাদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
এ দিকে ২০১৬ সনে ১০০ আসনের জন্য একটি ছাত্রাবাস ও ১০০জনের জন্য একটি ছাত্রীনিবাস নির্মাণের জন্য ২০১৬সনের ৯মাস উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে পত্র লেখেন। এ পত্রের আলোকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তৎকালীন কর্মকর্তাগন কলেজ পরিদর্শন ও দু’টি ছাত্রাবাসের জন্য স্থান নির্ধারণ করে সাইনবোর্ডও স্থাপন করেন। সাইনবোর্ড থাকলেও ১০বছরে এ ফাইলের আর কোনো অগ্রগতি জানেন কলেজে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এ প্রসঙ্গে কলেজের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সামছুন নাহার মুন জানান, কলেজের পিছনে মুকুল নিকেতন সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে আমরা সেই সময় সাইনবোর্ড দেখেছি, এখন তো সাইনবোর্ড নেই, ছাত্রীনিবাসও হয়নি।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, অনেক শিক্ষার্থী গৌরীপুরের বাইরে থেকে এসে কলেজে পড়াশোনা করেন। কিন্তুু আবাসন সঙ্কটের কারণে দুই সহ¯্রাধিক শিক্ষার্থী পৌর শহরের বালুয়াপাড়া, শান্তিবাগ, নতুন বাজার, ইসলামাবাদ, খেলারমাঠ, ছয়গন্ডা, কলাবাগান, গোলকপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় মেস ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। ভাড়া বেশি হওয়ায় মেসের ছোট একটি কক্ষে তিন থেকে চারজন থাকতে হয়। এছাড়াও বাড়ির মালিকদের নিয়মের কড়াকড়ির কারণে বেশির ভাগ মেসে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক মেসে পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে থাকেন মালিকগণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মেয়ে শিক্ষার্থী বলেন, ভাড়া বাড়িতে থাকতে গেলে নানা রকম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ভাড়াটিয়ার আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় বখাটেরা প্রায়ই উত্যক্ত করে। ফলে সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগতে হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সম্মান ২য় বর্ষের ছাত্রী পূজা সাহা বলেন, কলেজের অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী গৌরীপুরের বাইরের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে এখানে ভর্তি হয়েছে। ছাত্রীনিবাস নেই, ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বাহিরে থাকলে বাসার লোকজন ও প্রতিবেশীদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়।
ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীদের এসব দুর্ভোগের কথা স্বীকার করেন ছাত্রাবাসের দায়িত্বে থাকা কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক বিপুল সোহাগ। তিনি বলেন, যারা আছে অত্যন্ত কষ্টে ওরা দিনযাপন করছে। তিনি আরও বলেন, ¯œাতক ছাত্রাবাস করোনাকালীন সময় থেকেই পরিত্যক্ত। দু’দফায় টিনের ছাল ও বারান্দা ঠিক করে দেয়া হয়েছে। তবে সাপ্লাই, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পানি ও আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
গৌরীপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. রেদওয়ানুর রহমান বলেন, বর্তমান ছাত্রাবাসে যতটুক সম্ভব আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে তা মেরামত করে দিয়েছি। ছাত্রাবাস ও ছাত্রীবাস নির্মাণের জায়গা নির্ধারণ করে আবারও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ছাত্রাবাস নির্মিত হলে শিক্ষার্থীদের এ দুর্ভোগ থাকবে না।