
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে জাতীয় সমঝোতা ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা নিয়ে বর্তমান সরকার কাজ শুরু করেছে। তবে বিদ্যমান বাস্তবতায় আলো ও ছায়ার সংমিশ্রণ দেখা যাচ্ছে। সরকার একদিকে একতাবদ্ধ থাকার রাজনীতি, বিরোধী জোটকে ছাড় দেওয়া এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার যে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, তা বাস্তবায়ন এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের সময় বৃদ্ধির সাথে সাথে জনআকাক্সক্ষা পূরণ ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান স্থবিরতা স্পষ্ট হচ্ছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ জনমনে সৃষ্টি হচ্ছে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ।
বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং পুরোনো আমলাতান্ত্রিক বন্দোবস্তের অবসান ঘটানো। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কাগজ-কলমে বা কমিশন গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। অর্থনৈতিক স্বস্তি ফেরানো ও জনজীবনের মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও গতি দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারায় সরকারের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখানো হচ্ছে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার নীতিকে। বিগত দিনের বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের সর্বস্তরের রাজনৈতিক শক্তিকে এক কাতারে ধরে রাখার চেষ্টা করছে শাসক দল। বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালনায় একক প্রাধান্য না দেখিয়ে বিরোধী জোট ও রাজনৈতিক অংশীদারদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে বলে দেখানো হচ্ছে।
একাধিক ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর মতামতের গুরুত্ব প্রদান এবং সংসদীয় রাজনীতির দিকে রাজনৈতিক চর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপকে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই প্রবণতা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কমাতে সাহায্য করছে।
তবে এই ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর উল্টো পিঠে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা সাধারণ নাগরিক ও সচেতন মহলকে হতাশ করছে। পাশাপাশি, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দ্রুততা দেখাতে গিয়ে কয়েকটি বিতর্কিত আইন সংসদে উত্থাপন ও পাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আইনজ্ঞরা।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে ধীরগতি ও পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা। যে মৌলিক রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে সরকারের কৌশলগত স্থবিরতা এবং পুরোনো ব্যবস্থা ও আমলাতান্ত্রিক বন্দোবস্তকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন সংস্কারকামী রাজনৈতিক দল ও তরুণ সমাজ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একতাবদ্ধ থাকার শুভ উদ্যোগ এবং সংসদীয় ধারায় ফেরার চেষ্টা তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন সরকার মাঠপর্যায়ে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারবে। পুরোনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বন্দোবস্ত বহাল রেখে একটি নতুন ও দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব।
এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী বলেছেন, দেশের মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না; গ্যাস পচ্ছে না; রান্নার চুলা জ্বলছে না। খুন-খারাপিতে দেশ ভরে যাচ্ছে আর সংসদে রাজাকার, নন রাজাকার, দেশের পক্ষে দেশের বিপক্ষে এইসব বিষয় নিয়ে অহেতুক আলাপ হচ্ছে যা দেশের জন্য ভালো বার্তা দিচ্ছে না। বাংলাদেশ এখন একটা সংকটময় মূহুর্তে দাড়িয়ে আছে। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা একে অপরের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। বিএনপি অতীত থেকে শিক্ষা নেয় নাই। দলটির নেতারা সরকার গঠনের পর অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলছে। তারা পুরোনো পথে হাটছে। তাদের এই অবস্থানের ফলে সামনে আরও কঠিন সময় আসছে। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হলে বিএনপির উচিত জনগণ যেটা চায় সেটা মেনে নেওয়া।
এদিকে দিন ততো যাচ্ছে ততোই প্রকাশ্যে আসছে বিরোধী জোটের রাজনৈতিক কার্যক্রমে ভিন্নতা। সরকারকে তারা সহযোগিতা করতে চান এমন কথা বলার পাশাপশি চূড়ান্ত পরিণতির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বর্তমান সরকার প্রধানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তারেক রহমানকে ঠিক করতে হবে কীভাবে ক্ষমতা ছাড়বেন। তকেই নির্ধারণ করতে হবে যে তিনি কি হেলিকপ্টার করে পালিয়ে দেশ থেকে যাবেন, নাকি সম্মানের সঙ্গে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করবেন।বিএনপি সরকারে এসে জনগণের মানবাধিকার হরণ ও গণতন্ত্র ধ্বংস করছে। অতীতে যারা গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে তাদের পরিণতি ইতিহাসে লেখা রয়েছে। সবার সম্মতির ভিত্তিতেই সবাই মিলে গণভোটে অংশগ্রহণ করেছি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও সংস্কারের পক্ষে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচারণা করেছেন। কিন্তু নির্বাচনের পর বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পটপরিবর্তন হলেও এর আকাক্সক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তারা অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ পরিচালনা করতে যাচ্ছে। যার নিদর্শন ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। বর্তমান সরকার যে সময়টা সরকার পেয়েছে তা বেশি সময় নয়, কিন্তু বিকল্প পরিকল্পনা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে অপেক্ষা করার সুযোগও বেশি নেই বলে মনে করছে জামায়াত।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে জনগণের মতামত জানতে গণভোট হয়েছে এবং সেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। কিন্তু জনগণের এই রায়কে উপেক্ষা করেছে সরকার। এটি গণতন্ত্রের ওপর চপেটাঘাত এবং গণরায়ের প্রতি অবজ্ঞা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে।
সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বিষয়টি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে আরও স্পষ্ট হয়েছে। এতে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়েছে। জাতীয় সংসদে ৯ কার্যদিবসের অধিবেশনে ছয়টি বিল পাস হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ১৫টি প্রশ্নের উত্তরসহ বিভিন্ন মন্ত্রী দিয়েছেন ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর। ৩৫টি সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়ে এই অধিবেশনে। বিভিন্ন বিধিতে সংসদ সদস্যরা ১৫০টির বেশি নোটিশ দিয়েছেন। এছাড়া ভিন্নমত প্রকাশে বাধা ও হট্টগোলের পাশাপাশি জ্বালানি ও সারসংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে ফলাফল যা হওয়ার তাই। তবে এতোকিছুর পরও সরকার তাদের অবস্থানে এখন পর্যন্ত অনড় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেছেন, বর্তমান সরকার একটি জনকল্যাণমুখী ও জবাবদিহিমূলক সরকার। সরকারের যাবতীয় কার্যক্রম ও জনসেবামূলক পদক্ষেপ জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতু হিসেবে কাজ করছে।
তবে গুম-খুন, অরাজকতা ও মেগা দুর্নীতির এক ভগ্নস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দেশ পুনর্গঠনের কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। তিনি বলেন, অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে বিএনপির এই নীতিনির্ধারক বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতা গ্রহণের দ্বিতীয় দিন থেকেই তিনি তার কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণসহ নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছেন। দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক নানা ঘটনাপ্রবাহ উন্নয়নের গতিতে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করলেও সরকার তা অতিক্রম করে জনগণের স্বস্তি ও কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা চলছে।