প্রিন্ট এর তারিখঃ Sep 24, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Sep 24, 2026 ইং
মৃত্যু জীবনের গল্প

আনোয়ার সাদাৎ ইমরান
মৃত্যু আর জীবনের মাঝে বসে স্রষ্টার পদচুম্বন করেছি। একমাত্র তার পরম মমতায় ঘুর্ণিঝড়ের বিন্দুস্থলে অবস্থান করেও ঝড়ের সাথে সাথে এগিয়ে চলেছি। ঘুর্ণনের মহাচাপের রুদ্ধশ^াসে কোমায় চলে গিয়েছি। তারপরও হাল না ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহু আকবার।
মহান রাব্বুল আলামিনের অশেষ কৃপায় সাত বছরের অধিক সময় কোমায় থাকার পর দৈনিক প্রগতির আলো পুনরায় পাঠকের হাতে এসেছে। হাটি হাটি পা পা করে পত্রিকাটি ২৫ বছর পূর্ণ করে ২৬শে এগিয়ে চলছে। কন্টকাকীর্ণ পথচলায় প্রতিনিয়ত পাশে থাকা পাঠক, জীবনীশক্তি বৃদ্ধি করা বিজ্ঞাপনদাতা এবং সুন্দর মনের মানুষদের শুভাশিষের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা জানাই কবি-সাহিত্যিক, প্রিয় সহকর্মী সাংবাদিক বন্ধু, বিজ্ঞাপনকর্মী, গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও হকার ভাইদের প্রতি। বিশেষ করে কৃতজ্ঞতা জানাই স্নেহের রেজওয়ান শরীফ ও শুভন দাসকে। যারা সীমাহীন কষ্টে থেকেও অন্যায়ের সাথে আপোষ করেনি। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতাকে। যাঁদের দোয়া-আশীর্বাদ আমার ঢাল হয়ে কাজ করেছে সর্বসময়। আমার পথচলার শক্তি হিসেবে কাজ করা বড় ভাই এবং পাশে-সাথে থাকা ছোট ভাইয়ের প্রতি হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা-ভালোবাসা। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে, অভাব-অনটনে যে মানুষটি আগলে রেখে ক্লান্তি, অবষাদ, ভাবনা মুক্ত রাখার অবিরাম চেষ্টা করেছে আমার অর্ধাঙ্গীনীর প্রতি বিরামহীন ভালোবাসা।
সৌন্দর্য্য ও শুভ্রতার প্রতিক হলো ফুল। এই ফুলের আয়ু খুবই কম। তারপরও মানুষ ফুলকে ভালোবাসে। সুঘ্রাণ নেওয়ার জন্য নাশিকার কাছে তুলে ধরে। তার চেয়েও স্বল্প আয়ুষ্কালের ‘সংবাদ’ কাছে টেনে ইতিহাসের স্বাক্ষী বানাতে ২০০১ সালের ২৭ জুলাই দৈনিক প্রগতির আলো পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করি। পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকেই কাউকে উঠানো-নামানো দায়িত্ব পালন করেনি প্রগতির আলো পরিবার। পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ না করে সুস্থ্যধারার সাংবাদিকতা করে চলেছে। সত্য, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ফলে দৈনিক প্রগতির আলো পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিাআইবি) প্রদত্ত ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরষ্কার-সম্মাননা অর্জন করেছে।
আমাদের পথচলায় তিনদফা লঘুচাপ আঘাত হেনেছে। সুস্থ্য চিন্তার মানুষগুলোর সহযোগিতায় মহাক্রান্তিকাল অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে প্রগতির আলো পরিবার। ডিক্লারেশন বাতিলের চেষ্টা করা হয়েছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বঞ্চিত করা হয়েছে। খোদ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বিগত ২৫ বছরে দৈনিক প্রগতির আলো মাত্র একটি বিজ্ঞাপন পেয়েছে। পাঠক শুভানুধ্যায়িদের সহযোগিতায় প্রগতির আলোর অগ্রগতি-অর্জন আর ষড়যন্ত্রকারিদের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে সমানতালে।
২০১৭ সালে ঈর্ষাপরায়ন হিনমন্যতায় ভোগা অসুস্থ্য চিন্তক ব্যক্তিদের সৃষ্ট সুনামী আঘাত হানে প্রগতির আলো পরিবারে। সেই সুনামীর তান্ডবের গতি থামে ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল তারিখে দৈনিক প্রগতির আলো পত্রিকা প্রকাশনার ডিক্লারেশন বাতিলের মধ্য দিয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি আমলাদের ব্যবহার করে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামীলীগের প্রয়াত সভাপতি ও সেক্রেটারিসহ কয়েকজন ও কতিপয় সাংবাদিক নেতা মিলে মিথ্যা-অনিয়মকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই সুনামী সৃষ্টি করেছিলো। তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খান মো. নূরুল আমিন সম্পূর্ণ বিধি লঙ্ঘন করে দলীয় তাবেদারী করতে গিয়ে ১৯৭৩ সালের ছাপাখান প্রকাশনা (ঘোষণা ও নিবন্ধন) আইনের ২০এর ১(ঙ)(র) ধারায় দৈনিক প্রগতির আলো পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করেন। অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন ‘দৈনিক প্রগতির আলো পত্রিকার সম্পাদক মুহাম্মদ আনোয়ার সাদাৎ ইমরান ও তার পরিবারের সদস্যরা জামায়াত ইসলামী মনোভাবাপন্ন বিধায় প্রকাশনা অব্যাহত থাকলে আইন শৃঙ্খলা অবনতি হতে পারে।’
বিধিহীন ধারা প্রয়োগ করে পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করায় আপিল করা হয় বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের অ্যাপিলেট বোর্ডে। কয়েক দফা শুনানির পর বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের অ্যাপিলেট বোর্ড পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশনার আদেশ দেন। ওই আদেশের পত্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আটকে রেখে রিভিউ পিটিশন দায়ের করেন ইফতেখারুল অনুপম। (প্রগতির আলো পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিলের আবেদনও তিনিই করেছিলেন।) রিভিউকারীরা টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জোয়াহেরুল ইসলাম এমপির প্রত্যয়ন পত্র জমা দিয়ে অ্যাপিলেট বোর্ডের দেওয়া আদেশ রহিত করে পত্রিকা বন্ধের আদেশ দেন। তারপর থেকে চলমান আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ১জুন থেকে প্রগতির আলো পুনরায় পাঠকের হাতে পৌঁছে। আইনী লড়াইয়ে সার্বিক সহযোগিতা করেন জনাব অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী। রজত জয়ন্তীর এই দিনে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলীর প্রতি রইল অফুরন্ত শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
আওয়ামীলীগ নেতা ও কতিপয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ হওয়ার পেছনের কারণ ছিলো; ২০১৭ সালের শুরুর দিকে টাঙ্গাইলের ধুলের চর মাদরাসার কাছে বাণিজ্য মেলার আয়োজন করেছিলেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতারা। সেখানে আয়োজিত লটারি-জুয়ার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানি প্রতিবেদন করায় মেলা বন্ধ করে দেন জেলা প্রশাসন। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে সম্পাদক ও পত্রিকার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলে সম্মিলিতভাবে পত্রিকা বন্ধে পায়তারা করে সফল হন। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটতে দৈনিক প্রগতির আলো পরিবারের সময় লাগে সাত বছরের অধিক সময়।
বর্তমানে দৈনিক প্রগতির আলো নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দরিদ্ররূপে রজত জয়ন্তী সংখ্যা প্রকাশিত হলো। সমৃদ্ধ সুন্দর কিছু দিতে না পারার জন্য আন্তরিকভাবে দু:খিত। তবে আগামীতে দৈনিক প্রগতির আলো পরিবারের স্বপ্ন অনেক। সর্বমহলের সহযোগিতা পেলে সাধ-সাধ্যের সমন্বয় হবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের নানা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রজত জয়ন্তী সংখ্যা থেকে ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্র বর্ণমালা’র সূচনা সংখ্যা প্রকাশিত হলো। এই সাহিত্যপত্র নতুন নুতন লেখক, কবি, সাহিত্যিক সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে।
সর্বোপরি কল্যাণ যাত্রায় সর্বমহলের সহযোগিতা চাই। প্রশাসনিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ন্যায্যতার দাবি জানাই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় থেকে সুন্দর সমাজ গঠনে সবসময় ভালোকে স্বাগত জানাতে চাই। বিজ্ঞান বলে, ‘মানুষ ৪০ ইউনিট ব্যথা সহ্য করতে পারে।’ কিন্তু একজন মা সন্তান প্রসবের সময় ৫৪ ইউনিট ব্যথা সহ্য করতে বাধ্য হন। ব্যাথার তীব্রতায় অনেকে অকালে প্রাণ হারান। আবার অনেকে সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে সন্তান কোলে নিয়েই ভুলে যান সব ব্যথা-যন্ত্রণা। আজ আমিও অতীতকে ভুলে সন্তানের মতো করে প্রগতির আলোকে লালন পালন করতে চাই। দেশ ও জাতির নির্ভরতার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই।
রজত জয়ন্তীর এই দিনে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করছি। আমিও সকলের দোয়া সহযোগিতা কামনা করছি।
যে সহযোগিতা মানবকল্যাণের উদ্যোগকে করবে অনুপ্রাণিত ও গতিশীল।
আনোয়ার সাদাৎ ইমরান
সম্পাদক
দৈনিক প্রগতির আলো
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃdailyprogotiralo.com