
মো. সুমন জিহাদী
চীন বা ইন্দোনেশিয়ার যুবকরা বাংলাদেশি মেয়েদের প্রেমে পড়ে বরিশাল বা রংপুরে ছুটে চলে আসছে এমন খবর প্রায়শই পাওয়া যাচ্ছে । তথ্য-প্রযুক্তি আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে আন্ত সীমান্ত প্রণয় বা বিবাহ খুব অবাক কোনো বিষয় নয়।
কিন্তু একটি বিষয়ের আলোচনার সুযোগ এখানে তৈরি হয়েছে, তা হলো—আমাদের চেয়ে উন্নত দেশের নাগরিকরা কেন ধারাবাহিকভাবে এমন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে? প্রেমের পাশাপাশি আর কী কী কারণ এখানে থাকতে পারে, যা আমাদের তরুণী ও তাদের অভিভাবকদের জানা অত্যন্ত প্রয়োজন।
প্রথমত, চীনে এখন একটি শ্রেণির জন্য ‘ম্যারিজ স্কুইজ, বা ‘বিয়ের আকাল’ নামে এক ধরনের সমস্যা চলছে। যার অর্থ হলো চীনের নিম্নবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত পুরুষরা বিয়ের জন্য সঙ্গিনী খুঁজে পাচ্ছে না। ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিন এক সন্তান নীতি প্রচলন থাকায় সে দেশে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে ১০৭ জন পুরুষে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এতে সমাজে বিবাহ ও প্রেমের ক্ষেত্রে নারীদের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়। যার ফলে তুলনামূলক দরিদ্র বা আর্থিক ও সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ পুরুষদের জন্য সঙ্গিনী পাওয়া একটা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়। চীনের কোনো যুবক নিজ দেশে বিবাহের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম পূরণীয় শর্ত হলো তার নিজের একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট থাকতে হবে। কিন্তু গত দশ বছরে সেখানে বাড়ি ও ফ্ল্যাটের দাম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে; বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়।
এর কারণে বিয়ের প্রথম শর্তটি মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক যুবককে। পড়াশোনা করা, চাকরি পাওয়া, তারপর কাজ করে একটি বাড়ি কিনতে অনেক সময় চলে যায়। ব্যাংক লোন বা রিয়েল এস্টেট কিস্তির সুদের পরিমাণও অনেক চড়া এবং ঋণগ্রহীতার অবশ্যই একটি ভালো চাকরি বা কর্মসংস্থান থাকতে হবে। চাকরির মেয়াদ ও ভবিষ্যৎ স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকঋণ দিয়ে থাকে, যা সেই শ্রেণির যুবকদের জন্য খুব সহজ নয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই সঙ্গিনী পাওয়ার প্রতিযোগিতায় তারা আরো পিছিয়ে যাচ্ছে।
এ কারণে তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। সম্পর্কের এক পর্যায়ে তারা নিজেরাই মেয়েটির দেশে চলে যায়, ধর্মান্তরিত হয়েও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচিত হওয়া, সমুদ্র পার হয়ে অন্য দেশে চলে যাওয়া, এমনকি ধর্মান্তরিত হয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া নিঃসন্দেহে মহাযজ্ঞ এবং এ এক বিরল প্রেমের কাহিনি হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু তেমনটি বিরল না হয়ে একটি চর্চিত ঘটনায় পরিণত হওয়াতেই বোঝা যায়—শুধু প্রেম নয়, বরং ভেতরে আরো অনেক অদৃশ্য বিষয় রয়ে গেছে। তার কিঝু বিষয় অর্থনীতির, কিছু গল্প সমাজনীতির আর কিছু রীতিমতো অপরাধবিজ্ঞানের। এক দেশের মেয়েদের অন্য দেশের ছেলে গিয়ে বিয়ে করে নিয়ে আসার এই প্রবণতাকে চীনের গবেষক মেং এবং ঝাও ‘কনে পাচার’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা মনে করেন অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষে চীনের গ্রামের মেয়েদের অনেকে শহরের দিকে চলে যাচ্ছে। এতে গ্রামে বিবাহযোগ্য মেয়েদের সংখ্যা আরো কমে গিয়েছে। ফলে গ্রামভিত্তিক পেশার সঙ্গে জড়িত যুবকদের বিয়ে ও প্রেম উভয়েরই সম্ভাবনা কমে যায়। বাংলাদেশের যে মেয়েদের টানে এরই মধ্যে চীন থেকে যুবকরা এসেছে সেই মেয়েদের অনেকেই সাংবাদিকদের বলেছে, ফেসবুকের মাধ্যমে যুবকের সঙ্গে তার পরিচয়। অথচ চীনে ফেসবুক জনপ্রিয় নয় এবং বেশির ভাগ জায়গায় নিষিদ্ধ। চীনের নাগরিকরা উইচ্যাট নামে একটি নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে। তাহলে সে যুবকরা এ ব্যাপারে ওয়াকিফহাল যে দেশের বাইরের অন্য কোথাও সম্পর্ক করতে চাইলে উইচ্যাট বাদ দিয়ে ফেসবুক, বা ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করতে হবে। সুতরাং প্রেমে পড়ে আবেগতাড়িত হয়ে আসার পেছনে তাদের বেশ পরিশ্রম ও প্রস্তুতিমূলক টেবিল ওয়ার্ক আছে। প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর আগেই তারা নিজের উদ্যোগে পুরো প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিয়েছে, অনেকের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি জীবনের জন্য তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সুবিধাজনক ও সম্ভাবনাময় সঙ্গীকেই বেছে নিয়েছে। আমি কোনো স্টেরিওটাইপিং করছি না, তবু পড়াশোনা আর অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, শুধু প্রেম একজন চায়নিজ নাগরিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের একমাত্র উপকরণ হতে পারে না।
বাংলাদেশি মেয়েরা বিষয়টি নিয়ে বেশ আনন্দিত বলেই মনে হয়। কেননা উন্নত দেশের সুন্দর দেখতে কোনো যুবক যখন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে, সেই প্রেমের টানে নিজের দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে হাজির হয়, তখন নারীর মনে তার প্রেমের শক্তি ও শুদ্ধতার গৌরব সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক এবং সেটিকে ভুল বলার সুযোগ নেই। তবে তারা এই রকম সম্পর্কে কেন জড়াচ্ছে এটি জানা প্রয়োজন। একটি বিষয় পরিষ্কার যে এটি এক ধরনের মোহ, বিদেশপ্রীতি এবং আমাদের মননে অন্য দেশকে নিজ দেশ থেকে নিরাপদ ও সুন্দর মনে করার প্রবণতা। আমরা ধরেই নেই প্রবাসে গেলে সুন্দর একটি জীবন পাওয়া যাবে, নিরাপদ হবে আমাদের ভবিষ্যৎ জীবন। কিন্তু এখানে কিছু ঝুঁকির বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে । সুন্দর এই সম্ভাবনার আড়ালেও একটি মানবপাচারকারী চক্র মেয়েদের পাচার করার মতো ঘৃণ্য কাজটি করে যাচ্ছে। এমন খবরও শোনা গেছে যে বিয়ের যে পাত্রটি চীন দেশ থেকে ছুটে এসেছিল সে নিজেও চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত। দরিদ্র মেয়েদের লক্ষ্য করে খুব স্বাভাবিকভাবে বৈবাহিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর মেয়েকে তুলে দেওয়া হয় মানবপাচারকারী দলের হাতে। বিনিময়ে বর যুবক পায় বেশ কয়েক লাখ টাকা। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় চীনের আদালতের রায় বিশ্লেষণ করে এক হাজার ৩৭ জন প্রবাসী কনে ভুক্তভোগী শনাক্ত করা হয়েছে; সবচেয়ে বেশি ছিল ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকে। এই তালিকায় বাংলাদেশি নারীদের নাম যোগ হবে না সেটি আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। সুতরাং বাংলাদেশি মেয়েদের এ ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার আগেই অনেকগুলো বিষয়ে ভেবে নিতে হবে ।
প্রথমত, উন্নত দেশের সব নাগরিক উন্নত নয়। সেখানেও দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বঞ্চনা আছে; উন্নত দেশেও অপরাধ করে মানুষ। সে অপরাধ এখন আন্তর্দেশীয় এবং খুব সহজেই আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় আঘাত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রেমের কারণে প্রেম, আর স্বার্থের কারণে প্রেম দুটো ভিন্ন বিষয়। প্রেমের জন্য গৃহীত কোনো সিদ্ধান্তও মেধা দিয়েই যাচাই করা উচিত যে আবেগের আড়ালে কেউ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে কি না। কারো প্রেম অন্য কোথাও বাজারে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে কি না। তৃতীয়ত, পাণিপ্রার্থী প্রবাসী যুবক সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে চৈনিক বা বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে সংবাদ সংগ্রহ করে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত।
চীন, ইন্দোনেশিয়া বা তুরস্ক যে দেশই হোক না কেন, আমাদের জানতে হবে আবেগীয় সম্পর্কের আড়ালে বাস্তব সমাজের নির্মমতা সব সময়ই প্রবল থাকে। আধুনিক বৈশ্বিক গ্রাম ধারণার এ বিশ্বে মানুষ শহরমুখী এবং বিদেশমুখী। আর এই সুযোগে সৃষ্টি হয়েছে মানবপাচারের বিশাল এক সিন্ডিকেট। সেই সিন্ডিকেটের প্রতারণার শিকার হয়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী। মিলিয়ে এই আন্ত সীমান্ত প্রেম নতুন একটি প্রশ্নের সম্মুখীন করে আমাদের। এ দেশের তরুণীরা নতুন জীবনের স্বপ্নে অনিশ্চয়তার দিকে পা বাড়াচ্ছে না তো? তাহলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার এখনই সময়।
লেখক : পিএইচডি ফেলো, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, থাইল্যান্ড