প্রিন্ট এর তারিখঃ Oct 5, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Oct 4, 2026 ইং
ফেরিওয়ালা থেকে কোটিপতি সফল কৃষক মুসলেম

টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার মোসলেম উদ্দিন একসময় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বরইয়ের আচার বিক্রি করতেন। সেই ফেরিওয়ালা থেকে এখন তিনি টক বরই চাষের সফল উদ্যোক্তা। সখিপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ইন্দারজানি এলাকায় প্রায় ৫০ একর জমিতে গড়ে তুলেছেন বরইয়ের বাগান। এছাড়া তার বাগানে রয়েছে লেবু, মাল্টা। প্রতি মৌসুমে বাগান থেকে প্রায় এক কোটি টাকার টক বরই বিক্রি করেন তিনি। প্রায় এক যুগ ধরে দেশীয় টক বরই চাষ করছেন মোসলেম উদ্দিন। তার বাড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্ত্তনখোলা গ্রামে। মোসলেমের বড়ইয়ের বাগান দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে উপজেলার অনেকই বরই চাষে আগ্রহী হয়েছেন। কেউ কেউ এরই মধ্যে নতুন করে বাগানও গড়ে তুলেছেন।
জানা গেছে, কৃষিকাজের সঙ্গে মোসলেম উদ্দিন জড়িত প্রায় ১৫ বছর ধরে। এছড়া তিনি লেবু, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করেছেন। তবে বরই চাষে এসে তিনি পেয়েছেন আলাদা সাফল্য। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বড় পরিসরে গড়ে তুলেছেন এই বাগান। তবে শুরুর দিকে তার এ সাফল্য কঠিন ছিল। হাইব্রিড কিংবা উচ্চ ফলনশীল জাতের কারণে আমাদের দেশীয় জাতেরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় জাতের ফলগুলো পুষ্টি সম্মত এবং মানও ভালো। মোসলেম উদ্দিন সারা বাংলাদেশ থেকে দেশীয় জাত সংগ্রহ করে আবাদ করেছেন। টক বড়ই চাষ করে মোসলেম উদ্দিন ভালোই লাভবান হন। তার এ কাজটিকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। আমারও অনেকেই উৎসাহ দেই তার এ কাজ দেখে।
ফেরিওয়ালা থেকে সফল মোসলেম উদ্দিন বিগত ২০০০ সালের দিকে বাজার থেকে শুকনো বরই কিনে আচার তৈরি করতেন। পরে বিভিন্ন স্থানে মানুষের বাড়ি বাড়ি এবং রাস্তা রাস্তায় ফেরি করে বরইয়ের আচার বিক্রি করেন। সে সময় লাভও সীমিত ছিল। পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় লেবু চাষ করেন। এ সময় ধীর ধীরে লেবুর বাগান থেকে মোসলেম ভালো ফলন পেতে থাকেন এবং বিক্রিও করেন। পরে ফেরির কাজ বাদ দিয়ে বিগত ২০১২ সালে বড় পরিসরে ৬ একর জায়গায় লিজ নিয়ে লেবুর বাগান করেন। সে সময় বেশ সফলতা পান মোসলেম উদ্দিন। পরে মাল্টা এবং বরইয়ের বাগান গড়ে তুলেন তিনি। বিগত ২০১৪ সালে টক বড়ই আবাদ করে বেশ লাভবান হন মোসলেম। পরে তিনি টক বরই আবাদ করে আসছেন। বর্তমানে তিনি একজন সফল কৃষি উদ্যেক্তা হয়েছেন।
আগস্ট মাসের শুরু থেকেই তার বাগানের আগাম টক বরই বাজারজাত শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন বাগানে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। ভরা মৌসুমে শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ থেকে ৮০ জনে। ফলে তার বাগান ঘিরে তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ। তিনি বলেন, প্রথমে ফেরি করে টক বরইয়ের আচার বিক্রি করেছিলাম। পরে লেবু এবং মাল্টার বাগান করি। পরে টক বরইয়ের আবাদ করলে সাফল্য পেতে থাকি। ৫০ একরের বাগান লিজ নিয়ে টক বরই করেছি। প্রতি মৌসুমে এতে আমার খরচ হয় ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টাকা। বিক্রি হয় প্রায় ১ কোটি টাকার মতো।
জানা গেছে, প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ বস্তা বরই ঢাকার কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারে সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি বস্তায় ৬০ কেজি বরই থাকে। বর্তমানে প্রতি কেজি আগাম টক বরই ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত বরই বিক্রি করেন তিনি। মৌসুমের ভরা সময়ে বরইয়ের দাম কিছুটা কমে গেলেও তখন উৎপাদন ও সরবরাহ বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে এক মৌসুমে প্রায় এক কোটি টাকার বরই বিক্রি করেন বলে জানান মোসলেম উদ্দিন।
মোসলেম উদ্দিনের বাগানের টক বরইয়ের চাহিদা রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির কাছেও। বিশেষ করে প্যাকেটজাত আচার তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ টক বরই কিনে থাকে। ফলে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও এ ফলের ভালো চাহিদা রয়েছে। নিজে সফল হওয়ার পাশাপাশি মোসলেম উদ্দিন এখন এলাকার অন্য কৃষকদের কাছেও অনুপ্রেরণার নাম। দেশি জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে মোসলেম উদ্দিন সফলতা অর্জন করেছেন। সখিপুরের মাটি বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে এবং তাদের চাষাবাদে সহযোগিতা করতে কৃষি বিভাগের সহায়তা সবসময়ই চলমান রয়েছে। প্রায় ৫০ একর জমি লিজ নিয়ে গড়ে তোলা তার বরইয়ের বাগান এখন শুধু ফল উৎপাদনের জায়গা নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিরও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে অসংখ্য টক বরই। বাগানের ভেতর ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। কেউ গাছ থেকে বরই পাড়ছেন, কেউ ঝুঁড়িতে তুলছেন, আবার কেউ বস্তায় ভরছেন। এরপর এসব বরই চলে যাচ্ছে ঢাকার বড় বড় পাইকারি বাজারে। মোসলেম উদ্দিনের বাগানের কর্মচারী মিনহাজ উদ্দিন বলেন, আমি ৭ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। বাগানের সব পরিচর্যাই আমি করি। আরেক কর্মচারী শাহিন মিয়া বলেন, কাজের চাপ থাকলে দীর্ঘক্ষণ কাজ করতে হয়। আমি বাগানের পরিচর্যা করি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করতে হয়। স্থানীয় মাছুম আহমেদ বলেন, মোসলেম উদ্দিনের সফলতা দেখে আমি প্রায় দুই বছর ধরে বড়ইয়ের চাষ করছি। বর্তমানে ১৫০ শতাংশ জমিতে বরইয়ের গাছ রয়েছে আমার। এবর আমার ১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছি ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার লাভ হবে।
কৃষি উদ্যোক্তা মোসলেম উদ্দিন বলেন, প্রথমে ফেরি করে টক বরইয়ের আচার বিক্রি করেছিলাম। পরে লেবু এবং মাল্টার বাগান করি। পরে টক বরইয়ের আবাদ করলে সাফল্য পেতে থাকি। ৫০ একরের বাগান লিজ নিয়ে টক বরই করেছি। প্রতি মৌসুমে এতে আমার খরচ হয় ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টাকা। বিক্রি হয় প্রায় ১ কোটি টাকার মতো। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বাজারে দাম ভালো থাকলে আশা করছি এবার ভালো বিক্রি করতে পারবো। এতে আমার ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছি। আমার এখানে ৩ থেকে ৪ জাতের টক বরই রয়েছে। বছরে দুই বার টক বরই চাষ করে থাকি। আগাম এবং সিজনাল সময়ে চাষ করা হয়। সন্তানদের লেখাপড়াসহ সংসারের যাবতীয় খরচ এ পেশার উপর নির্ভরশীল। কৃষি বিভাগ থেকেও আমাকে বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বেকার তরুণ-তরুণীরা বরই চাষ করে সফলতা অর্জন করতে পারেন। বাংলাদেশের মাটি বরই চাষের জন্য খুবই উর্বর। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে অবশ্যই এই পেশায় সফলতা অর্জন করা সম্ভব।
এ বিষয়ে সখিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন বলেন, দেশি জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে মোসলেম উদ্দিন সফলতা অর্জন করেছেন। সখিপুরের মাটি বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে এবং তাদের চাষাবাদে সহযোগিতা করতে কৃষি বিভাগের সহায়তা সব সময়ই চলমান।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃdailyprogotiralo.com