
যমুনা ও ধলেশ্বরীর দুর্গম চরাঞ্চলে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় আধুনিক পলিসেড হাউস প্রযুক্তির মাধ্যমে আগাম শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করছেন স্থানীয় কৃষকরা। শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মরিচ, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি চরাঞ্চলে কৃষির নতুন সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন করছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর আওতায় নাগরপুর উপজেলার ভাড়রা ও দপ্তিয়র ইউনিয়নে দুটি পলিসেড হাউস স্থাপন করা হয়েছে। এসব শেডে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপদ ও মানসম্মত চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।
পলিসেড হাউসে পলিথিন, লোহা বা বাঁশের কাঠামো ব্যবহার করে চারাগাছকে প্রতিকূল আবহাওয়া, অতিবৃষ্টি ও ক্ষতিকর পোকামাকড় থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চারার জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এতে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় চারার গুণগত মান ও উৎপাদন সফলতা বাড়ছে।
এ পদ্ধতিতে মাটির বিকল্প হিসেবে নারিকেলের খোসা প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি প্রাকৃতিক তন্তু ‘কোকোপিট’ ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি আর্দ্রতা ধরে রাখার পাশাপাশি চারার শিকড়ে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলে সহায়তা করে। ফলে শেকড় পচনসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমে যায়।
বর্তমানে এসব পলিসেড হাউসে আগাম শীতকালীন শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মরিচ, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। আগাম চারা উৎপাদন করতে পারায় মৌসুমের শুরুতেই বাজারে চারা সরবরাহের সুযোগ পাচ্ছেন কৃষকরা। এতে চাহিদা অনুযায়ী ভালো দামে চারা বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন তারা।
ভাড়রা চরের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ৫ শতক জমিতে পলিসেড হাউস স্থাপনের পর তার কৃষিকাজে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। গত তিন মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ করে চারা উৎপাদন করে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকারও বেশি বিক্রি করেছেন তিনি। এতে খরচ বাদে তার নিট লাভ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শীতকালীন মরিচের চারা উৎপাদনে তিনি ভালো সাফল্য পেয়েছেন। প্রতিটি চারা উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ৭০ পয়সা। বাজারভেদে এসব চারা ১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬৫ হাজার টাকার মরিচের চারা বিক্রি করেছেন তিনি। চলতি মৌসুমে আরও প্রায় ৩ লাখ টাকার চারা বিক্রির আশা করছেন।
জাহাঙ্গীর আলমের সাফল্য দেখে ভাড়রা ইউনিয়নের অন্যান্য কৃষকরাও পলিসেড হাউস প্রযুক্তিতে চারা উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। স্থানীয় কৃষকদের মতে, আগাম শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করতে পারায় বাজারে এসব চারার চাহিদা ও দাম তুলনামূলক বেশি। ফলে চরাঞ্চলের কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি নাগরপুরের পলিসেড হাউসে চারা উৎপাদন, এলএলপি (এলএলপি)-এর মাধ্যমে সেচ এবং ভার্মিকম্পোস্ট প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর পরিচালক মো. জিয়াউর রহমান এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিচালক মো. শাহেদুর রহমান।
পরিদর্শনকালে প্রকল্প পরিচালক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, “চরাঞ্চলে কৃষিকে আরও লাভজনক ও টেকসই করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। পলিসেড হাউসের মাধ্যমে প্রতিকূল আবহাওয়া ও মৌসুমি ঝুঁকি মোকাবিলা করে মানসম্মত চারা উৎপাদন করা সম্ভব। এর ফলে কৃষকরা আগাম শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এই প্রযুক্তি চরাঞ্চলের কৃষকদের আয় বৃদ্ধি ও কৃষির বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
নাগরপুর উপজেলা কৃষি অফিসার এস এম রাশেদুল হাসান বলেন, “পলিসেড হাউস উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও নিরাপদ সবজির চারা উৎপাদনের একটি আধুনিক প্রযুক্তি। বিশেষ করে প্রতিকূল আবহাওয়ার সময়ও চারা উৎপাদন করে কৃষকরা বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন। এ প্রযুক্তি যমুনা ও ধলেশ্বরীর চরাঞ্চলের কৃষিতে টেকসই পরিবর্তন আনার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করছে।”
কৃষি সংশ্লিষ্টদের আশা, আধুনিক এ প্রযুক্তির আরও সম্প্রসারণ ঘটলে যমুনা ও ধলেশ্বরীর চরাঞ্চলের অনাবাদি ও ঝুঁকিপূর্ণ জমিগুলো কৃষির আওতায় আসবে। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ার মাধ্যমে চরাঞ্চলের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।