
মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল
শরতের শান্ত-স্নিগ্ধ প্রকৃতি, কুয়াশাভেজা ভোর, নদীর কূলে কূলে শুভ্র কাশফুলের দোলা আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের কাঠির মিষ্টি ধ্বনিলয় ‘মা দুর্গা’র মর্ত্যে আগমনের বার্তা পৌঁছে দেয়। আশ্বিন ও কার্তিক মাসের সূচনালগ্নে অনুষ্ঠিত এই শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধানতম ধর্মীয় মহোৎসবই নয় বরং এটি বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির এক অনবদ্য সামাজিক প্রপঞ্চ। বাহ্যিক কোলাহল, আলোকের ঝরনাধারা, নতুন বস্ত্র পরিধান আর প্রতিমা বিসর্জনের প্রথাগত আড়ম্বরের গভীরে ডুব দিলে দেখা যায়- দুর্গোৎসবের মূল বার্তা লুকিয়ে রয়েছে মানব জীবনের চরম আধ্যাত্মিক দর্শনে। এটি মানুষের ভেতরকার সুপ্ত আত্ম-উপলব্ধিকে জাগ্রত করার এবং ব্যক্তি থেকে সমাজ জীবন পর্যন্ত সার্বিক আত্মোন্নয়ন সাধনের এক মহান জীবনমুখী শিক্ষা প্রদান করে। ইতিহাস ও শাস্ত্রীয় দর্শনের আলোয় এই উৎসবের ভেতরের সত্য ও তাৎপর্য অনুধাবন করা আজকের পরিবর্তিত সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি।
উৎসবের গভীরে প্রবেশ করতে হলে প্রথমেই পূজা ও উৎসব- এ দুটি মূল শব্দবন্ধের ব্যাকরণগত ও বুৎপত্তিগত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা প্রয়োজন। ‘পূজা’ শব্দটি সংস্কৃত ‘পূজ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত। এই পূজ ধাতুর মূলার্থ হচ্ছে ‘বর্ধনশীলতা’ বা বৃদ্ধিসাধন। অর্থাৎ, যে প্রক্রিয়া বা আচারের মাধ্যমে মানুষের ভেতরের সৎ চিন্তা, বিবেক, প্রজ্ঞা এবং আত্মিক গুণাবলির পরম বৃদ্ধি ও উৎকর্ষ ঘটে, তা-ই পূজা। অপরদিকে, ‘উৎসব’ শব্দটির উৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে ‘উৎস অভিমুখে গমন’। উৎসব মানুষের চেতনাকে জড়তা থেকে মুক্ত করে কল্যাণময় পরম উৎসের দিকে পরিচালিত করে। অতএব, গভীর দর্শনের বিচারে পূজা বা উৎসব- দুটি শব্দই মূলতঃ একই অর্থ ও উদ্দেশ্য বহন করে। দুটি শব্দই মানুষকে তার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে সত্তার প্রকৃত উৎসের দিকে নিয়ে যায় এবং জীবনের শুভ ভাবগুলোকে বর্ধিত করে। এ কারণেই ভারতীয় দর্শনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে- ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচারের বিষয় হলেও, ‘উৎসব’ সর্বজনীন এবং সবার।
হাজার বছরের আবহমান সংস্কৃতির ধারায় হিন্দু শাস্ত্রের এই পবিত্র পার্বণে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আনন্দ-উৎসবে একাত্ম হয়ে মেতে ওঠে সমগ্র বাঙালি হৃদয়। সেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা সামাজিক মর্যাদার কোনো প্রাচীর থাকে না। ভেদাভেদ, জাত-পাত ও হিন্দু-মুসলিম পরিচয় ‘উৎসবের’ এই মিলনমেলায় এসে একাকার হয়ে যায়। দুর্গাপূজা তাই কেবল একটি সম্প্রদায়ের পুজো থাকে না, তা রূপান্তরিত হয় সম্প্রীতির এক অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন মিলন মহোৎসভে।
সনাতন শাস্ত্র ও প্রাচীন গ্রন্থাবলীতে দেবী দুর্গার মহিমা ও স্বকীয় রূপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর গূঢ় অর্থে বিবৃত হয়েছে। ‘দুর্গা’ শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ হলো ‘দুর্গতি-নাশিনী’- যিনি জীবের জীবনের সকল প্রকার দুর্গতি, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক দুঃখ দূর করেন। দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসবের প্রকৃত তত্ত্বার্থে পূজা শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে- যা সম্পাদন করলে জীবনে বাস্তব ও আত্মিক উভয় ক্ষেত্রের উন্নয়নের পথ সুপ্রশস্ত হয়। শাস্ত্রীয় সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্গা নামের প্রতিটি বর্ণ ও ধ্বনি নির্দিষ্ট প্রতীকী শক্তির বাহক- ‘দ’ অক্ষর: দৈত্যনাশক (অসুরবৃত্তি বা হিংস্রতার বিনাশক)। ‘উ-কার’: বিঘ্ননাশক (জীবনের সব বাধা ও প্রতিবন্ধকতা দূরকারী)। ‘রেফ’: রোগনাশক (শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি দূরকারী)। ‘গ’ অক্ষর: পাপনাশক (অন্যায় ও অপরাধবোধ প্রক্ষালনকারী)। ‘অ-কার’: ভয় ও শত্রুনাশক (সকল ভয় ও বহিঃ-অন্তঃ শত্রু বিনাশকারী)। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ এবং ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি জীবকে নিরন্তর রক্ষা করেন এবং সার্বিক কল্যাণ দান করেন- তিনিই দুর্গা।
সংস্কৃত অভিধান ‘শব্দকল্পদ্রুম’-এর পংক্তিতে দেবীর পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে- ‘দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা’ যার অর্থ- দুর্গ নামক অত্যাচারী অসুরকে যিনি বিনাশ করেন, তিনি শাস্ত্রে নিত্য ‘দুর্গা’ নামে অভিহিত হন। আবার সনাতন ধর্মশাস্ত্র ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’ বা ‘দেবী মাহাত্ম্যম’-এর ভাষ্য অনুসারে, দেবী দুর্গা কোনো একক ব্যক্তি বা সীমিত দেবী সত্তা নন; বরং তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল দেবতার শক্তি, তেজ ও শুভ ভাবনার একীভূত ও একসূত্রে গঠিত এক মহাশক্তির প্রতিমূর্তি। যুগে যুগে জগতে যখনই অন্যায়, অধর্ম, স্বৈরাচার ও পাপের আধিক্য ঘটেছে, তখনই দুষ্টের বিনাশ এবং সৃষ্টের পালনে দেবী দুর্গা ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকট হয়েছেন। শাস্ত্রানুসারে শ্রী শ্রী দুর্গা দেবীর অজস্র নাম রয়েছে, যার মধ্যে- মহাশক্তি, ব্রহ্মময়ী, আদ্যাশক্তি, নারায়ণী, চণ্ডী, মহিষ-মর্দিনী ও অসুর নাশিনী- এই নামগুলো বিশেষ পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
দুর্গাপূজার ইতিহাস অতি প্রাচীন। বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে পৌরাণিক কাল এবং মধ্যযুগ পার হয়ে আধুনিক কাল পর্যন্ত এর ঐতিহাসিক বিবর্তন লক্ষণীয়। (ক) সত্য যুগ- সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য মহামায়ার আরাধনা করে হারানো রাজ্য ও জ্ঞান লাভ করেন (বসন্তকালের ‘বাসন্তী পূজা’)। (খ) ত্রেতা যুগ- শ্রী রামচন্দ্র লঙ্কার অধিপতি রাবণ বধের উদ্দেশ্যে শরৎকালে দেবীর অকালবোধন করেন, যা ‘শারদীয় পূজা’ নামে পরিচিত হয়। (গ) মধ্যযুগ- বাংলার রাজা ও ভূস্বামীরা (যেমন কংসনারায়ণ, ভবানন্দ মজুমদার) দুর্গাপূজাকে সামন্তীয় আড়ম্বরে রূপ দেন। এবং (ঘ) আধুনিক যুগ- বারোয়ারি ও সার্বজনীন পূজার সূচনা; ব্যক্তিকেন্দ্রিক আড়ম্বর পেরিয়ে দুর্গাপূজা গণমানুষের উৎসবে পরিণত হয়। ঐতিহাসিক বিবর্তনের এই ধারা প্রমাণ করে- দুর্গাপূজা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতার নাম নয় বরং এটি যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে।
দুর্গোৎসবের সবচেয়ে প্রাঞ্জল ও গভীর শিক্ষাটি লুকিয়ে রয়েছে দেবী দুর্গার রণরঙ্গিনী রূপ এবং তাঁর পদাশ্রিত ‘মহিষাসুর’- এর প্রতীকী যুদ্ধের মধ্যে। দেবীর দশহাতে দশটি অস্ত্র, চরণে দলিত মহিষাসুর, বাহন সিংহ- এই প্রতিটি উপাদানের অন্তরালে রয়েছে সুগভীর মানসিক ও আত্মিক দর্শন। বাহ্য দৃষ্টিতে মহিষাসুর একটি বাহ্যিক দানব হলেও, প্রকৃত তত্ত্ব দর্শনে মহিষাসুর হলো মানুষের নিজস্ব মনের কুপ্রবৃত্তি বা ‘ষড়রিপু’-র প্রতীক। মানুষের আত্মোন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো তার নিজস্ব অন্তরের ছয়টি শত্রু: (১) কাম (অনিয়ন্ত্রিত কামনা), (২) ক্রোধ (উন্মাদ হিংস্রতা), (৩) লোভ (অন্যের বস্তুর প্রতি লালসা), (৪) মোহ (অজ্ঞানতা ও অন্ধত্ব), (৫) মদ (অহংকার ও দম্ভ) এবং (৬) মাৎসর্য (ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতা)। দেবী দুর্গার সিংহবাহন রূপটি হলো অনুভূতির সংযম ও বলের প্রতীক। যখন মানুষ দুর্গারূপী আত্মচেতনা বা পরম প্রজ্ঞাকে জাগ্রত করে, তখন সে তার ভেতরের পাশবিক মহিষাসুরকে বধ করতে সক্ষম হয়। আত্ম-উপলব্ধি ব্যতিরেকে জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য অনুধাবন করা অসম্ভব। পূজা কেবল বাইরের মৃণ¥য়ী প্রতিমায় পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার নাম নয় বরং মৃণ¥য়ীর মাঝে চিন্ময়ী শক্তিকে অনুভব করে নিজের মনের সমস্ত কলুষতা, সংকীর্ণতা ও অহংকারকে বিসর্জন দেওয়াই হলো প্রকৃত আত্ম-উপলব্ধি।
আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে হিংসা, বিদ্বেষ, ধর্মান্ধতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং পরমতঅসহিষ্ণুতা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এই সংঘাতময় বাস্তবতায় দুর্গোৎসবের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও কালোপযোগী। (ক) সংযম ও আত্মশুদ্ধি: দুর্গোৎসব আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে ভোগের মধ্য দিয়েও ত্যাগের অনুশীলন করা যায়। দেবীর শক্তি আমাদের আত্মশুদ্ধির পথ দেখায়। (খ) নারীশক্তির মর্যাদা (স্ত্রীশক্তি সম্মান): দেবী দুর্গা স্বয়ং নারীশক্তির সর্বোচ্চ প্রতীক। আজকের সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে দুর্গাপূজার দর্শন আমাদের প্রেরণা জোগায়। (গ) সামাজিক সম্প্রীতি: দেবীর দশহাতের দশটি অস্ত্র আমাদের শেখায়Ñসব সামাজিক অনাচার, অসমতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। যেভাবে বিভিন্ন দেব-দেবীর সম্মিলিত তেজ থেকে দুর্গার আবির্ভাব হয়েছিল, ঠিক তেমনি সমাজের সব ভালো মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই কেবল কুসংস্কার, বিভেদ ও অন্যায়-অবিচার প্রতিহত করা সম্ভব।
শারদীয় দুর্গাপূজার সমাপ্তি ঘটে প্রতিমা বিসর্জনের করুণ সুরের মধ্য দিয়ে। বিজয়া দশমীতে দেবী প্রতিমাকে জলে বিসর্জন দেওয়া হলেও মূলত তা বস্তুর নশ্বরতা ও চেতনার অবিনশ্বরতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। বিসর্জনের আসল বার্তা হলো- প্রতিমার সাথে সাথে আমাদের অন্তরের ঘৃণা, অহংকার, হিংসা ও ক্ষদ্র স্বার্থচিন্তাকে বিসর্জন দেওয়া। যদি দেবী বিসর্জনের পর মানুষের ভেতরের পশুত্ব জীবিত থেকে যায়, তবে সেই পূজার আয়োজন সার্থক হয় না।
পরিশেষে বলা যায়, দুর্গাপূজা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সাময়িক সামাজিক আনন্দ-প্রদর্শন নয়; এটি আত্মচেতনা ও প্রজ্ঞার পরম তীর্থক্ষেত্র। দুর্গোৎসবের এই মহতী তিথিতে জাত-পাত ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়া আবশ্যক। দেবী দুর্গার আরাধনার মাধ্যমে ভেতরের সত্য ও শুভ শক্তিকে জাগিয়ে তুলে, আত্ম-উপলব্ধির পরম আলোয় জীবনকে উদ্ভাসিত করে এবং একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও সম্প্রীতিময় সমাজ গঠনে আত্মোন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক পাথেয়।