নিরঞ্জন পাল
মির্জাপুরে আজও অটুট রয়েছে সাহেব বাড়ির দুর্গাপূজার আকর্ষণ। সাহেব বাড়ির দুর্গাপূজা উপভোগ না করলে পূজার আনন্দ যেন অপূর্ণই থেকে যায়। শুধু দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেই দর্শনার্থীরা মন্ডপটিতে ভিড় করেন না বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতগণও এই মন্দিরটিতে ভিড় করেন পূজা উপভোগ করতে। সাহেব বাড়ির পূজা বলতে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির দুর্গাপূজাকেই বুঝায়। অত্র এলাকার মানুষ এই পূজাটিকে সাহেব বাড়ির পূজা নামে আখ্যায়িত করতেন। প্রবীণদের কাছে এখনও পূজাটি সাহেব বাড়ির পূজা নামেই পরিচিত।
প্রায় ৩শ বছর আগে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার শরিকরা পাটখড়ি দিয়ে তৈরী একটি মন্ডপে দুর্গাপূজা করতেন। পরবর্তীতে ১৯৪২ সাল থেকে মন্ডপটিতে জাগজমকভাবে পূজা শুরু করেন দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। পূজার সময় প্রতিবছর মন্ডপের পশ্চিম পাশে মাঠে লঙ্গরখানা খুলে শত শত মানুষকে খাওয়াতেন তিনি। ১৯৫২ সাল থেকে পূজা উপলক্ষে মন্ডপ প্রাঙ্গন থেকে দরিদ্র মানুষের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ করতেন দানবীর রণদা। ১২ জোড়া ঢাকির তালে চলতো পূজার্চনা। পাশে তৈরী ৬০ ফুট উচু নহবতখানা থেকে বাজানো হতো সানাইয়ের সুর। পূজাকে ঘিরে সপ্তাহব্যাপী চলত দেশের নামীদামী কোম্পানী দলের যাত্রাপালা।
অত্র অঞ্চলের মানুষের প্রধান আকর্ষণ হলো দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির দুর্গাপূজা। অন্য বছরের মত এবারও লৌহজং নদী ঘেষা এই বাড়িটিতে সেত পাথরের মন্দিরে ধুমধামে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
শুরু থেকে শেষঅবধি পর্যন্ত স্থানীয়রা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থরা ভিড় করেন পূজা মন্ডপটিতে। মন্ডপ সংলগ্ন লৌহজং নদীতে নিজস্ব দুইটি রঙিন বজরা দিয়ে কুমুদিনী পরিবারের সদস্য ছাড়াও দেশী বিদেশী দর্শনার্থীদের হরদম চলে পারাপার। পাশে নদীর ধারে উচুঁ নহবতখানা থেকে ভেসে আসে সানাইয়ের সুমধুর সুর।
কুমুদিনী পরিবারের অন্যতম সদস্য কুমুদিনী হাসপপতালের পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার রায় জানালেন, তৎকালে গ্রামের মানুষ রণদা প্রসাদ সাহাকে রণদা সাহেব বলতেন। সে কারণেই দুর্গাপূজার সময়ও এই পূজাকে তাঁরা সাহেব বাড়ির পূজা বলতেন।
ভেদহীন পূজামন্ডপটির প্রধান আকর্ষণ হলো পূজার প্রথম দিন থেকে সন্ধ্যায় ভারতেশ্বরী হোমসের মেয়েদের মনমুগ্ধকর আরতি নৃত্য। এছাড়াও দুর্গা পূজার ওপর দেব-দেবীদের নিয়ে মনোজ্ঞ গীতিনাট্য পরিবেশন করেন হোমসের মেয়েরা। এ সময় ঢাকের গুরগুর শব্দ, কাশ, শঙ্খ, ঘন্টা ও ধুপের গন্ধে মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দিরঅঙ্গন। এক কথায় পাঁচদিন ব্যাপী দুর্গাপূজা চলাকালিন রণদার দুর্গা মন্ডপটির দর্শনার্থীদের ভিড়ে পরিণত হয় এক মহামিলন কেন্দ্রে।
কুমুদিনী পরিবারের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য ভাষা সৈনিক কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গলের পরিচালক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রতিভা মুৎসুদ্দি ভাষ্যমতে, জ্যেঠামনির (রণদা প্রসাদ সাহা) পূর্বপুরুষরা তিনশ বছর আগে থেকে মন্দিরটিতে পূজা করতেন। বড় ছেলে রবি জন্ম গ্রহণের পর জ্যেঠামনি বাংলা ১৩৫০ সালে মন্দিরটি নতুনভাবে নির্মাণ করেন। সেই থেকে মন্দিরটি সার্বজনীন রূপ নেয়।
অবিভক্ত বাংলায় সর্ব প্রথম মা দুর্গার প্রার্থনা উৎসব ঐতিহাসিক ভাবে করেন কৃষ্ণচন্দ্র। কালক্রমে দেবী দুর্গার পূজা ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়।
জানা যায়, ষোড়শ শতকে বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার তাহিরপুরে রাজা কংস নারায়ণ সর্বপ্রথম শারদীয় দুর্গাপূজা করেন। এই কংস রাজার পূজা মন্ডপ থেকেই ধীরে ধীরে এদেশে পারিবারিক দুর্গাপূজা সার্বজনীন পূজায় রূপ নেয়। বাংলাদেশে পারিবারিক ও সার্বজনীন দুর্গা মন্ডপের মধ্যে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার দুর্গা মন্ডপটি ব্যতিক্রমী এবং উল্লেখযোগ্য একটি দুর্গা মন্ডপ।
দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার জীবনে একসময় অসুর তুল্য দারিদ্রতা চেপে বসে। দারিদ্রতার কষাঘাতে এক সময় রণদা দিশেহারা হয়ে পড়েন। অভাবের তাড়নায় অসুস্থ মাকে চিকিৎসা করাতে পারলেন না তিনি। বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন মা কুমুদিনী। কিশোর রণদা স্নেহময়ী মাকে হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। মাকে হারিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন মা কত প্রেমময়ী ও স্নেহময়ী। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘আমার মায়ের মত আর কারো মাকে বিনা চিকিৎসায় মরতে দেবনা’। সে সময় দুর্গম অসুরের মতই বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। চুপ করে থাকতে পারলেন না রণদা। বিদ্রোহী কবি নজরুলের সাথে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে বাঙালিদের দলে যোগ দেন রণদা। যুদ্ধ জয়ের নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে রণদা নেমে পড়েন কর্ম জীবনে। কর্ম জীবনে রণদা দ্রুত প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
রণদা যখন উন্নতির শিখরে উঠেন ঠিক তখনই তিনি তার প্রতিজ্ঞার প্রতিদান বাস্তবায়নের জন্য মনস্থ করলেন। ১৯৩৫-৩৬ সালে অসহায় মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা দানের জন্য হাসপাতাল নির্মাণের জন্য নির্মাণ সামগ্রী আনতে শুরু করলেন রণদা প্রসাদ। একই সাথে তিনি তার পারিবারিক দুর্গা মন্দিরটিও নতুন রূপে নির্মাণের জন্য নির্মাণ সামগ্রী আনতে শুরু করেন। প্রতিজ্ঞার ফলশ্রুতিতে মির্জাপুর লৌহজং নদীর এক পাড়ে ৭৫০ শয্যার মা কুমুদিনীর নামে কুমুদিনী হাসপাতাল (বর্তমানে ১ হাজার ৫০ বেড) এবং অপর পাড়ে নতুন ভাবে তিনি নির্মাণ করেন দুর্গা মন্ডপটি। সকল গোত্রের পূজারী ও ভক্তবৃন্দসহ রণদার পূজা মন্ডপে প্রতিবছর দেশী বিদেশী শত শত দর্শনার্থী ভিড় জমায়। দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা সকল সম্প্রদায়ের গরিব দুঃখিদের মাঝে নিজ হাতে পূজা উপলক্ষে শাড়ি, লুিঙ্গ ও ধূতি বিতরণ করতেন। চার দিন ব্যাপি চালু থাকত লঙ্গর খানা।
রণদার দুর্গা মন্ডপের প্রধান আকর্ষণ ছিল পূজা উপলক্ষে সাপ্তাহ ব্যাপি যাত্রানুষ্ঠান। বাংলাদেশ এবং কলিকাতার খ্যাতনামা অপেরার শিল্পীরা অভিনয় করতেন এই যাত্রামঞ্চে। উল্লেখযোগ্য অপেরার মধ্যে ছিল নাট্যকোম্পানী সপ্তম্বর অপেরা গণেশ অপেরা চারণিক অপেরা ও বিবেকানন্দ এ্যামেচার। দানবীর রণদা প্রসাদ সাহাও সীতার পালায় রামের অভিনয় করতেন বলে তার প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন। মির্জাপুরে তখন দুর্গাপূজা হতো উৎসব মুখর পরিবেশে। রণদার পূজা মন্ডপকে ঘিরে গ্রামের প্রত্যেক বাড়িই আত্মীয় স্বজনে পরিপূর্ণ থাকতো। এখনও রণদা দুর্গা মন্ডপটির সকীয়তা আগের মতই বজায় রয়েছে।
১৯৭১ সালে ৭ মে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে ধরে নিয়ে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ও তাঁর পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহা রবিকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। এরপর থেকে বেশ কয়েক বছর রণদা প্রসাদ সাহার পূজা মন্ডপের জৌলুসতা কিছুটা ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু নানা ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে রণদা দুর্গা মন্ডপের মৌলিকত্ব ও ঐতিহ্য এখনও অটুট রেখেছে কুমুদিনী পরিবার।
মির্জাপুরে এবছর ২৭১টি মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক, ই-মেইল হরৎলঢ়ধঁষ@ুধযড়ড়.পড়স