ছবির ক্যাপশন:
নিষিদ্ধ (অপ্রয়োজনীয় ও ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনবিহীন) ওষুধে প্রসিদ্ধ জরুরী বিভাগ। রোগীর আর রোগের নয়; সিন্ডিকেটের কবজ¦ায় ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম। রোগীদের সুস্থতার নামে তাদের প্যাকেট কেটে অবৈধভাব লাভবান হচ্ছে এ চক্রটি। এসব ওষুধের নাম লেখার চেয়ে জরুরী বিভাগে আগত একেরপর এক রোগীকে নিষিদ্ধ ওষুধের নামযুক্ত সিল মেরে দিতে দেখা যায়। শুধু ওষুধ নয়, চর্মরোগের জন্য দেয়া সাবানের গায়েও বিএসটিআই বা দেশীয় অনুমোদনকারী সংস্থার সিল-লগো দেখা যায়নি। গত সোমবার হাসপাতালে এমন পরিস্থিতির দেখা মিলে।
হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ৪ বছরের ফায়েজ মায়ের কোলে উঠে আসেন চিকিৎসা নিতে। দেখা যায়, ওষুধ প্রশাসনের ডিআরভুক্ত না থাকলেও সেই শিশু বাচ্চাটির ব্যবস্থাপত্রে সিলমারা (কখঙঞওঢ চখটঝ খটঞওঙঘ) একটি লোশনের নাম লিখে দেয়া হয়। এমন নিষিদ্ধ ওষুধের সিল ছিলো শুধু জরুরী বিভাগ নয়, বহি:বিভাগের কক্ষেও। ৯৭০৮৭নং ক্রমিকের ওই ব্যবস্থাপত্রে ডাক্তারের স্বাক্ষর ও তারিখ নেই। ডিআরভুক্ত না থাকলেও ডেনছুরাসহ ওষুধসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ সাবান ও লোশনের নাম প্রত্যেকটি ব্যবস্থাপত্রে সিল মেরে দেয়া হচ্ছে। মইলাকান্দা ইউনিয়নের নপাই গ্রামের আবুল কাসেমের স্ত্রী জোসনা আক্তার (৩৪) জানান, হাসপাতালে এর আগেও আসছি। এই যে মলম লিখে দিয়েছে, তা কাজে আসে নাই। এলাকাবাসী জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসারের বরাদ্দকৃত গাড়িটিও দীর্ঘদিন যাবত গৌরীপুরে দেখা যাচ্ছে না।
জরুরী বিভাগে আগত রোগীদের অভিযোগ, ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিরাই মূলত হাসপাতালের ওষুধের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জরুরী বিভাগে রোগী আসার পরে ডাক্তারের দেখা বা পর্যবেক্ষন শেষ হওয়ার আগেই এগিয়ে আসতে দেখা যায় ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিদের। ডাক্তার ওষুধ লেখার আগেই তারা ওষুধের নাম বলে দিচ্ছেন। হাসপাতালের জরুরী বিভাগ ও তার আশপাশেই ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিরা হাসপাতালে থাকছেন সার্বক্ষনিক।
অপরদিকে হাসপাতালের বর্হি:বিভাগের দরজা ৯টায় খোলা হলেও ডাক্তারের কক্ষে কোনো ডাক্তার ছিলেন না। সকাল ৮টা থেকে রোগীরা এসে হাসপাতালের বারান্দা আর ফ্লোরে বসে থাকতে দেখা যায়। অপরদিকে দুপুর ১টার পরেই হাসপাতালের বর্হি:বিভাগের ফটক বন্ধ হয়ে যায। হাসপাতালে সকাল ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত সেবা কার্যক্রমের বিধান থাকলেও এ বিধান মানা হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে বোকাইনগর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার আজিজুল হক বলেন, সকাল ৮টায় আসছি। এখন ৯টা বাজে কোনো ডাক্তার আসে নাই।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সকাল ৮টা ১২মিনিটে প্রবেশ করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. দিবাকর ভাট। তবে ডাক্তারদের আগমন ঘটে ৯টার পরে। হাসপাতালের ক্লোজসার্কিট ক্যামেরায় (সিসি ক্যামেরা) এ প্রতিনিধিকে দেখে বহি:বিভাগে ছুটেন আসেন এ হাসপাতালের বড় কর্তা ডা. দিবাকর ভাট।
জরুরী বিভাগের এসব সিলমারা ওষুধ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এসব ওষুধ তো চর্ম বিভাগের ডাক্তারগণের বিষয়। জরুরী বিভাগে এতো সিল সেটা আমার জানা ছিলো না। অপ্রয়োজনীয় ওষুধের সিল আজই সরিয়ে দেয়া হবে। তিনি আরও জানান, এ হাসপাতালে আসার পরে সেবার মান ও রোগীদের খাবার অনেক পরিবর্তন এসেছে। সর্বোচ্চ সেবা দেয়া চেষ্টা চলছে।
ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সপ্তাহের শুধুমাত্র সোমবার ও বৃহস্পতিবার দু’দিন ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিগন ডাক্তার ভিজিট করতে পারবেন মর্মে প্রজ্ঞাপন রয়েছে। এর বাহিরে তাদের প্রবেশ করার সুযোগ নেই। স্থানীয় প্রতিনিধিরা রোগী আছে বা রোগীর লোক পরিচয়ে অনেক সময় ঢুকে যান। তবে আনসার-ভিডিপি নিয়োগের পর থেকে তা কমে গেছে। তিনি আরও জানান, এ হাসপাতালের নামে বরাদ্দকৃত গাড়িটি বর্তমানে সিভিল সার্জন ব্যবহার করছেন। চালক ও তেল বরাদ্দ না থাকায় তিনি ব্যক্তিগত যানবাহনে চলাচল করেন।
এ দিকে হাসপাতালে জনবল সংকটের কারণে সেবাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমান শূন্য রয়েছে জুনিয়র কনসালন্টে (গাইনী), সহকারী সার্জন ৫জন, ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ৩জন, মেডিকেল অফিসার ১জন, আবাসিক মেডিকেল অফিসার ১জন, সিনিয়র স্টাফ নার্স ৫জন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফী ও ইমেজিং), প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক ১জন, স্বাস্থ্য পরিদর্শক ৩জন, পরিসংখ্যানবিদ ১জন, স্টোর কিপার ১জন, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ৫জন, সহকারী নার্স ১জন, স্বাস্থ্য সহকারী ১৩জন, জুনিয়র মেকানিক ১জন, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ২জন, নিরাপত্তা প্রহরী ১জন, আয়া ২জন, মালী ১জন, অফিস সহায়ক ১জন, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ৩জন ও ওয়ার্ডবয় ২জন। জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালে সেবা কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।