টাঙ্গাইলের উত্তর জনপদের নিরালোক বনতলে যুগ যুগ ধরে স্তুপিকৃত অন্ধকারের মধ্যে আলো জ্বালাবার মতো একটি মননশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে। এই প্রতিষ্ঠান যারা গড়েছেন তাদের বিষয়জ্ঞান কেমন জানিনা তবে মননশীলতায় তাদের উচ্চতা অনেকের চেয়ে বেশি। বেশি বলেই তারা প্রচলিত বৈষয়িক ভাবনার বিপরীতে তিমির হননের গান গেয়ে চলেছেন। এই প্রান্তিক জনপদকে ভালোবেসে তারা রয়ে গেছেন প্রান্তদেশে। কোন প্রেরণা তাদেরকে জীবনের এই জটিল পথে নিয়ে গেলো তা বলা কঠিন।
বলছিলাম টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত ‘প্রগতির আলো’ পত্রিকা ও তার প্রতিষ্ঠাতাদের সম্পর্কে। যে ভাবনা থেকেই তারা এই উদ্যোগ গ্রহণ করুন না কেনো, জীবন যাপনের এই প্রেরণা সরল কোনো ব্যাপার না। উনিশ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক মনীষী জীবনের ভোগ বিলাসিতা অগ্রাহ্য করে পত্রিকা প্রকাশকে জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এ পথে জীবন যাপনের জন্য ন্যুনতম অর্থের সংস্থান হবে না জেনেও তারা পিছিয়ে যাননি। কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। সকলেই এটা করেন না। সকলেই পারেন না। কেউ কেউ পারেন। যারা পারেন কিংবা করেন তারা ইতিহাসে নাম লেখান।একেই বলে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া। সেই দিক থেকে ‘প্রগতির আলো’ নামটি সার্থক হয়েছে।
এই আকালের কালে ‘প্রগতির আলো’ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে পঁচিশ বছর পার করেছে। এই দীর্ঘ পথচলায় তাদের শত শত বাঁধা অতিক্রম করতে হয়েছে। আর্থিক দুর্শশার সাথে জীবনের বিপন্নতা তাদের এই কণ্টকাকীর্ণ পথ থেকে সরাতে পারেনি। বরং মননশীল কাজকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করা এবং সেই বন্ধুর পথে ভয়হীন এগিয়ে চলা অনেকের জন্য নিরন্তর প্রেরণার উৎস হতে পারে।
গত তিন দশকে টাঙ্গাইলের নানা প্রান্ত থেকে একাধিক দৈনিক পত্রিকা বের হয়েছে। প্রথিতযশা সাংবাদিকদের হাত ধরে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তারা টিকে আছে। প্রগতির আলো সেই টিকে থাকার সংগ্রামে অন্যতম বিজয়ী যোদ্ধা। বিজয়ের এই পথ নির্মাণ করতে করতে এই পত্রিকার সাংবাদিকরাও প্রগতিশীল সাংবাদিকতা রপ্ত করেছেন।
সিকি শতাব্দী ধরে প্রগতির আলো টাঙ্গাইলের সাংবাদিকতাকে মফস্বলের গণ্ডী থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। এই পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট সম্পাদক ও সংবাদকর্মীগণ নিজেদের রক্ত-অশ্রু-হাড় দিয়ে সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের সাথে সাথে পত্রিকাকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। নিপুণ কারিগরের মতো তারা সমাজের অন্ধকার গলিতে একের পর এক তীব্র আলো ফেলে অন্ধকার দূর করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। নির্মোহ সততার সাথে কাজ করার জন্য এই পত্রিকার সাংবাদিক জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। এই পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে টাঙ্গাইলের সাংবাদিকতা শুধু সম্মানিত হয়নি বরং ভালো সাংবাদিকতার নব সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে।
প্রগতির আলোর এগিয়ে চলার পথ মোটেই মসৃণ ছিলো না। আমরা জানি, পথ মসৃণ হলেই সে পথ সঠিক বলা যায় না। আবার বন্ধুর পথে হেঁটে হেঁটেও গন্তব্যে পৌছানো যায়। গ্রগতির আলোকে কঠিন পথে চলতে হয়েছে। নানা অপবাদ সয়ে তাদেরকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবুও হাল ছাড়েননি সংশ্লিষ্টরা। এই যে হাল না ছাড়ার অদম্য মনোভাব এটাই এই পত্রিকাটিকে অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখবে। এই বেঁচে থাকা মানে তুমুলভাবে বেঁচে থাকা, অর্থবহভাবে বেঁচে থাকা এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য নিরন্তর কাজ করা। আমরা বিশ্বাস করি, বিগত পঁচিশ বছরে অর্জিত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রগতির আলো অনেক দূর হেঁটে যাবে। এই যাত্রা হবে নিরন্তর প্রগতির পথে।
মোহাম্মদ কামাল হোসেন
১৪.০৯.২০২৬