মীর আব্দুল আলীম
একজন মানুষ বাজারে গেলেন। মাছ কিনলেন, সবজি কিনলেন, ফল কিনলেন, মসলা কিনলেন, সন্তানের জন্য দুধ বা বিস্কুট কিনলেন।
তারপর নিশ্চিন্ত মনে সেই খাবার পরিবারের সামনে তুলে দিলেন। কিন্তু তিনি কি জানেন, যে খাবারটি তিনি কিনে আনলেন, তার ভেতরে কী আছে? জানেন কি, সেটি তার শরীরের জন্য নিরাপদ কি না? সাধারণ মানুষের তা জানার কথাও না। মূলত জানার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাহলে রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন রাখা যেতে পারে, বাজারে এত ভেজাল প্রবেশ করে কী করে? সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি তাদের দায়িত্ব পালন করে না?
এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।
কারণ এটি শুধু খাদ্যের মানের প্রশ্ন নয়, এটি মানুষের জীবনের প্রশ্ন। একজন মানুষ রাষ্ট্রের কাছে খুব বেশি কিছু চান না। তিনি চান নিরাপদে বাঁচতে, নিরাপদ পানি পান করতে, নিরাপদ বাতাসে শ্বাস নিতে এবং অন্তত যে খাবার কিনে নিজের সন্তানকে খাওয়াচ্ছেন, সেটুকু যেন বিষ না হয়। অথচ বাজারে যদি খাদ্যে ভেজাল থাকে, ক্ষতিকর উপাদান থাকে, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য থাকে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য তৈরি হয়, আর এসবের বিরুদ্ধে অভিযান হয় শুধু মাঝেমধ্যে, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থাকবে বিষমুক্ত খাদ্যের নিশ্চয়তা কে দেবে?
ভেজাল খাবারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এর অপরাধ অনেক সময় শব্দ করে আসে না।
কোনো বিস্ফোরণ হয় না, সাইরেন বাজে না, রাস্তায় মানুষ জড়ো হয় না। একজন মানুষ আজ ভেজাল খাবার খেলেন, কালও খেলেন, পরশুও খেলেন। তারপর একদিন তার শরীরে দেখা দিল জটিলতা। চিকিৎসা শুরু হলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হলো।
হাসপাতালের বিছানা, ওষুধ, চিকিৎসকের ফি, পরিবারের সঞ্চয় শেষ হতে লাগল। অথচ কেউ হয়তো তখনো জানলেন না, বহুদিন ধরে তার শরীরে যে ক্ষতির বোঝা জমছিল, তার পেছনে অনিরাপদ খাদ্যেরও ভূমিকা থাকতে পারে। সব রোগের জন্য কোনো একটি খাবারকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়, কিন্তু ক্ষতিকর ও অনিরাপদ খাদ্য যে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে ভেজাল খাবারকে নিছক বাজারের অনিয়ম বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার দিন শেষ হওয়া দরকার।
বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্যের জন্য আইন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, অভিযান আছে, মোবাইল কোর্ট আছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কাজ করছে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালাচ্ছে, স্থানীয় প্রশাসনও বিভিন্ন সময়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এর পরও যদি একই বাজারে বারবার একই ধরনের অনিয়ম ফিরে আসে, তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আইনে? প্রয়োগে? নজরদারিতে? নাকি অপরাধীর ভয় না পাওয়ার মধ্যে? ২০২৬ সালেও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখ পুরোপুরি বন্ধ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের চোখ খোলা থাকলেও অপরাধীর হাত বন্ধ হচ্ছে না কেন?
এখানেই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কোনো বাজারে অভিযান হলো, কয়েকটি দোকানে জরিমানা হলো, কিছু পণ্য ধ্বংস করা হলো, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে পড়ল। এরপর কয়েক দিন কেটে গেল। আবার আগের মতো ব্যবসা শুরু। এই ব্যবস্থা যদি ভেজালকারীর কাছে ভয় নয়, বরং ব্যবসার একটি সম্ভাব্য খরচ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে ভেজাল বন্ধ হবে কিভাবে? বড় ব্যবসায়ী কয়েক লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে যদি পরদিন আরো বড় অঙ্কের ব্যবসা করতে পারেন, তাহলে সেই জরিমানা তাঁর কাছে শাস্তি, নাকি ব্যাবসায়িক ব্যয়—রাষ্ট্রকেই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, আইন সবার জন্য সমান হতে হবে। ছোট দোকানে অভিযান চালিয়ে আইন প্রয়োগ দেখানো আর বড় উৎপাদনকারী, বড় আমদানিকারক, বড় সরবরাহকারী কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে। একটি ভেজাল পণ্য দোকানে এসে হঠাৎ তৈরি হয় না। তার পেছনে থাকে উৎপাদক, সরবরাহকারী, পরিবেশক, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা একটি সম্পূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা। তাই শুধু শেষ প্রান্তের দোকানদারকে ধরে সমস্যার সমাধান হবে না। ভেজালের উৎস পর্যন্ত যেতে হবে। যে কারখানায় পণ্য তৈরি হয়েছে, যে প্রতিষ্ঠান তা বাজারজাত করেছে, যে নেটওয়ার্ক তা ছড়িয়ে দিয়েছে সবকিছুর তদন্ত করতে হবে।
আর এখানেই রাষ্ট্রের কঠোর হওয়ার প্রয়োজন। ভেজালের অপরাধ সব ক্ষেত্রে এক রকম নয়। অসাবধানতাজনিত অনিয়ম এবং জেনেশুনে মানুষের জন্য ক্ষতিকর খাদ্য বাজারজাত করা এক বিষয় নয়। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন উপাদান ব্যবহার করেন, যার ক্ষতিকর দিক তিনি জানেন, তার পরও শুধু মুনাফার জন্য সেই পণ্য মানুষের হাতে তুলে দেন, তাহলে তাকে সাধারণ ব্যাবসায়িক অনিয়মের কাঠামোয় বিচার করলে চলবে না। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড, লাইসেন্স বাতিল, প্রতিষ্ঠান বন্ধ, পণ্য প্রত্যাহার, অবৈধ মুনাফা জব্দসহ আইনে যে কঠোর ব্যবস্থা আছে, তা কার্যকর করতে হবে। আর কোনো ঘটনায় তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে যদি প্রচলিত ফৌজদারি আইনের গুরুতর অপরাধ, এমনকি হত্যার উপাদানও প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেই অনুযায়ী বিচার হওয়া উচিত।
কারণ মানুষের জীবন কোনো পণ্যের লেবেল নয়, যে ভুল হলে শুধু জরিমানার স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া যাবে। মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করার অধিকার কারো নেই। খাদ্য ব্যবসা লাভের ব্যবসা হতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্য ধ্বংস করে লাভ করার ব্যবসা হতে পারে না। একজন ব্যবসায়ী যেমন তাঁর মুনাফার হিসাব করেন, রাষ্ট্রকেও তেমনি হিসাব করতে হবে ভেজাল খাদ্যের কারণে সমাজের কত মানুষ অসুস্থ হচ্ছেন, কত পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে পড়ছে, কত কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, কত মানুষ অকালে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন। একটি জরিমানার অঙ্ক দিয়ে সেই সামাজিক ক্ষতির হিসাব কখনোই মেটানো যায় না।
তাই ভেজালবিরোধী অভিযানকে উৎসবের মৌসুমি আয়োজন বানালে চলবে না। রমজান এলে অভিযান, ঈদ এলে অভিযান, কোনো অভিযোগ এলে অভিযান এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ, দ্রুত পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, ফলাফল সংরক্ষণ এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। একই প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে তার আগের রেকর্ড বিবেচনায় নিতে হবে, বারবার অপরাধ করলে আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে খাদ্য অপরাধের জন্য বিশেষায়িত তদন্তদল এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষায়িত আদালত বা বেঞ্চের কথাও ভাবতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, এই ব্যবস্থায় কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিচয় যেন ঢাল হয়ে না দাঁড়ায়। কারণ ভেজাল খাদ্যের কোনো দল নেই, কোনো শ্রেণি নেই, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। ভেজাল ধনী-গরিব দেখে শরীরে ঢোকে না। একজন মন্ত্রী, একজন ব্যবসায়ী, একজন শ্রমিক, একজন রিকশাচালক, একজন সাংবাদিক, একজন কৃষক সবাই একই বাজার থেকে খাবার কিনতে পারেন। যে খাবার আজ একজন দরিদ্র মানুষের ক্ষতি করছে, কাল সেই খাবারই একজন ধনী মানুষের টেবিলেও উঠতে পারে। খাদ্যের বিষ মানুষের সামাজিক পরিচয় দেখে আক্রমণ করে না।
তাহলে রাষ্ট্র কেন অপরাধীর পরিচয় দেখে নরম হবে? এই প্রশ্নের উত্তর জনগণ চায়। আমরা চাই না প্রতিটি বাজারে পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকুক। আমরা চাই না প্রতিটি খাবার খাওয়ার আগে মানুষের সন্দেহ থাকুক। আমরা চাই এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ বিশ্বাস করতে পারবেন যে রাষ্ট্র তাঁর খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। বাজারে যে খাবার বিক্রি হচ্ছে, সেটি নির্ধারিত মান পূরণ করছে—এই বিশ্বাসটুকু একজন নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তার অংশ।
আজকের শিশুর শরীরের ভেতরে আগামী দিনের বাংলাদেশ তৈরি হচ্ছে। সেই শিশুর হাতে যদি আমরা নিরাপদ খাবারের বদলে ভেজাল তুলে দিই, তাহলে শুধু একজন শিশুকে নয়, একটি প্রজন্মকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিই। একটি রাষ্ট্র রাস্তা, সেতু, ভবন, বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে উন্নত হতে পারে, কিন্তু তার মানুষ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, সেই উন্নয়নের ভিত দুর্বল হয়ে যায়। তাই এখন আর শুধু প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রের কাছে দাবি ভেজালবিরোধী আইনকে কার্যকর করুন। অভিযানকে নিয়মিত করুন। বড়-ছোট সব অপরাধীর বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নিন। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কারাদণ্ডসহ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করুন। আর যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের জীবন বিপন্ন করার প্রমাণ আছে, সেখানে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের সর্বোচ্চ প্রযোজ্য শাস্তি নিশ্চিত করুন। কারণ ভেজাল খাবার শুধু বাজারের সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রের নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। এটি জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্ন।
সব শেষে আবার সেই প্রশ্নেই ফিরতে হয় রাষ্ট্র যদি মানুষের জীবন রক্ষার জন্য, মানুষের নিরাপদ খাদ্যের জন্য, বাজারের প্রতিটি পণ্যের জন্য দায়িত্বশীল না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? মানুষ খাবার কিনতে বাজারে যায়। মৃত্যু কিনতে নয়।
লেখক : সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক