আধুনিকতার জয়জয়কার আর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। সময়ের বিবর্তনে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে এক এক করে হারিয়ে যাচ্ছে লোকজ ঐতিহ্যের নানা অমূল্য নিদর্শন। আধুনিক কৃত্রিম সামগ্রীর দাপটে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ নারীদের ঐতিহ্যবাহী অলংকার নারিকেলের তৈরি 'ওড়ং' এবং রান্নাঘরের নিত্যব্যবহার্য বাঁশের 'কুইনচা নাহোর'।
একসময় গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক অনন্য রূপ ছিল নারিকেলের মালা দিয়ে তৈরি 'ওড়ং'। গ্রাম্য কারিগররা তাদের নিপুণ দক্ষতা ও নান্দনিক সৃজনশীলতা দিয়ে নারিকেলের মালা, সুতা এবং দেশীয় উপকরণের সমন্বয়ে হাতে তৈরি করতেন এই বিশেষ অলংকার। বিয়ে, মেলা কিংবা বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গ্রামীণ নারীদের সাজসজ্জায় ওড়ং ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
মধুপুরে এক কারিগরের তৈরি করা ওড়ংগুলো হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করছে। হাঁটার সময় ওড়ংয়ের মিষ্টি শব্দ গ্রামীণ উৎসবে ভিন্ন মাত্রা যোগ করত।
-
অন্যদিকে, গ্রামীণ গৃহিণীদের রান্নাবান্না ও খাবার পরিবেশনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছিল বাঁশের তৈরি 'কুইনচা নাহোর'। মাটির চুলায় ধোঁয়া ওঠা পাতিল থেকে পরিবারের সদস্যদের পাতে ভাত বেড়ে দিতে গৃহিণীরা নির্ভর করতেন এই কুইনচার ওপর। শুধু ভাতই নয়, ডাল কিংবা নানা রকমের তরকারি পরিবেশনেও ওড়ং ও কুইনচার ব্যবহার ছিল সর্বজনীন।
-
তখনকার দিনে এসব বস্তু কেবল দৈনন্দিন প্রাত্যহিক প্রয়োজন মেটানোর হাতিয়ার ছিল না; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গ্রামীণ পারিবারিক মেলবন্ধন, লোকজ সংস্কৃতি এবং আবেগঘন স্মৃতি।তবে কালের পরিক্রমায় প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও আধুনিক অলংকারের বাজার সয়লাব হওয়ায় রূপসী বাংলার এসব স্বকীয় সামগ্রী এখন মেঠোপথ থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন। বাজারে সহজলভ্য আধুনিক উপকরণের ভিড়ে নতুন প্রজন্মের কাছে 'ওড়ং' কিংবা 'কুইনচা নাহোর' নামটিই এখন একদম অচেনা। ব্যবহার না থাকায় এবং সঠিক মূল্য না পাওয়ায় এসব পণ্য তৈরির দক্ষ কারিগররাও এখন পেশা বদলে বাধ্য হচ্ছেন।
- গ্রামের প্রবীণ মানুষদের মতে, ওড়ং ও কুইনচা কেবল পুরোনো - দিনের ব্যবহার্য বস্তু নয়; এগুলো আমাদের স্বকীয়তা ও গ্রামীণ - জীবনযাত্রার মূল প্রতিচ্ছবি। সময়ের তোড়ে এসব হারিয়ে গেলেও পুরোনো প্রজন্মের হৃদয়ে তা আজও স্মৃতির মণিকোঠায় - অমলিন হয়ে আছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আমাদের এই লোকজ ঐতিহ্য ও স্মারকগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে জাদুঘর কিংবা প্রদর্শনীতে সংরক্ষণ করা জরুরি।
একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের কাছে এসব হারিয়ে যাওয়া - রূপকথাকে পরিচিত করে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে - উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শেকড় ও - নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে।