বিশেষ প্রতিবেদক
টাঙ্গাইলের রাজনীতি সময়ে সময়ে বিভিন্ন পরিবারের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। প্রভাবশালী আলোচিত পরিবার হলো খান পরিবার আর সিদ্দিকী পরিবার। এই দুই পরিবারের বিরোধ বাধিয়ে একক রাজত্ব কায়েম করে বরাবর ফায়দা লুটে গেছেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি প্রয়াত ফজলুর রহমান খান ফারুক। যিনি দীর্ঘদিন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামীলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে অভিভাবকত্ব করে গেছেন।
টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক মহাসচিব গোলাম কিবরিয়া ওরফে বড় মনি’র টেলিফোনে কথোপকথনের একটি রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে বিষয়টি সর্বসাধারণের সামনে আসে।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই রেকর্ড নিয়ে জেলর সর্বত্র চলছে আলোচনা।ওই কথোপকথনে গোলাম কিবরিয়াকে বলতে শোনা যায় কীভাবে ফজলুর রহমান খান দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ লাগিয়ে একক রাজনীতি করতেন। এক সময় গোলাম কিবরিয়ার কাছে ফজলুর রহমান খান সেই বর্ণনা দিয়েছিলেন। টেলিফোনে কথোপকথনে গোলাম কিবরিয়া ফজলুর রহমানের উদ্বৃতি দিয়ে সেকথাই জানিয়েছেন অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে। তবে ওই ব্যক্তিকে তা জানা যায় নি।
২০২৪ সালে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান খান আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপন অবস্থাতেই ওই বছর অক্টোবর মাসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি জেলা পরিষদেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। এর আগে তিনি ছিলেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে মির্জাপুর আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন। তার ছেলে খান আহমেদ শুভ টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচতি হয়েছিলেন।
অপর দিকে যার কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরেছে সেই গোলাম কিবরিয়া ওরফে বড় মনি টাঙ্গাইল শহর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। জেলার রজনীতিতে তিনি ফজলুর রহমানের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তিনি ভারতে চলে যান। পরে সেখান থেকে জার্মান যান বলে তার ঘনিষ্ট সুত্র জানিয়েছে। গোলাম কিবরিয়া টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান ওরফে ছোট মনিরের ভাই।
গোলম কিবরিয়া কার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
ওই রেকর্ডে গোলাম কিবরিয়াকে বলতে শোনা যায়, “শোন ভাই একটা কথা কই, আমরা যাই করি খান পরিবারের রাজনীতির মূল বিরোধীতা করছে ফারুক সাব। তোমারে ব্যাখ্যা দেই, তুমি বুঝতে পারবা। ফারুক সাব নিজে কইছে আমারে যে, ‘মনি দেখো আমি একটা মানুষ। থানাপাড়া থাকি। আমার কোন গুন্ডা বদমাইস পোলাপান কিচ্ছু নাই। কিন্তু আমি টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ নাচাইছি।”
এরপর গোলাম কিবরিয়াকে বলতে শোনা যায়, কয়কি লোকটা (ফজলুর রহমান খান)। শোন, ‘লতিফ সিদ্দিকীকে আমি কোনদিন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হবার দেই নাই। খান পরিবার-সিদ্দিকী পরিবারের মধ্যে বাজাইয়া রাখছি আমি ফারুক। কারণ যদি খান পরিবার ও সিদ্দিকী পরিবার এক হইয়া যায়, আমার মত ফারুক যেডি আছে যাইয়া গাতায় (গর্ত) পরতো। হয় সিদ্দিকী পরিবার সিনিয়র হইতো খান পরিবার তাগো জুনিয়র হইতো। অথবা খান পরিবার সিনিয়র হইতো মান্নান সাব, শামসুর রহমান খানরা সিনিয়র হইতো। কাদের সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকী জুনিয়র হইতো। হেরা হেরাই সব হইতো। শামসুর রহমান খান সভাপতি হইলে লতিফ সিদ্দিকী বা কাদের সিদ্দিকী সাধারণ সম্পাদক হইতো। তাগো দেওন লাগতো। এজন্য আমি ফারুক কোনদিন তাগো এক হইতে দেই নাই। এটা অসম্ভব। আর আমার সাথে কাম করছে মুকুল ভাই (মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি)। তারও কোন এলাকা নাই পোলাপান নাই। সেইও আওয়ামী লীগের নেতা আছিলো আমরা খালি সকালে এক কান কথা লাগাইছি বিকালে এক কথা লাগাইছি।’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর খান পরিবারের চাপে থাকা প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান কি বলেছেন সে প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে গোলাম কিবরিয়াকে বলতে শোনা যায়, ফজলুর রহমান খান তাকে বলেছে ‘ওয়াক্তে ওয়াক্তে কাকন (খান পরিবারের সন্তান, সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খানের ভাই) বাঁধা দিতো। তহন আমি চিন্তা করি আরে ভাই আমারতো অস্তিত্ব থাকে না, আমিতো পুতুল হইয়া গেলাম গা। আমি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমার কোন স্বাধীনতা নাই। পরে তোমরা আইলা, তোমরাতো বিরুদ্ধেই আছিলা। পরে চিন্তা করলাম, তোমরা নতুন পোলাপান আনাড়ী, নতুন নেতৃত্ব দিবা তোমাগো অনেক ভুল হবো। আমাকেই তোমাগো বাপ তোমাগো মা মানতে হবো।’
শেষের দিকে গোলাম কিবরিয়াকে বলতে শোনা যায়, ফজলুর রহমান খান তাকে বলেছিলেন, ২০১৪ সালে খান পরিবার টাঙ্গাইল থেকে চলে যাওয়ার পর ১০ বছর আমি ফারুক একক ভাবে টাঙ্গাইল আওয়ামী লীগ চালিয়ে গেছি। টাঙ্গাইলের ইতিহাসে আর কেউ পারে নাই। টাঙ্গাইলের জন্মের পর থেকে ১৯৭০ -এর পর থেকে টাঙ্গাইলের ইতিহাসে কেউ একক ভাবে রাজনীতি করতে পারে নাই।