টাঙ্গাইল ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস ও চারলেন সড়ক নির্মাণে ধীরগতির কারণে ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের দূর্ভোগ পোহাতে হবে। এছাড়া লক্কর-ঝক্কর মার্কা পরিবহনের আধিক্য, দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত গাড়ীর চাপ আর বেপরোয়া গাড়ি চালানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা ভোগান্তিকে বাড়িয়ে দেবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যাত্রি, পরিবহনের চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জানা যায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনাসেতু মহাসড়কের ৬৫ কিলোমিটার টাঙ্গাইল জেলার আওতাভুক্ত। এরমধ্যে চন্দ্রা থেকে টাঙ্গাইল হয়ে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৬ লেন। অপরদিকে এলেঙ্গা থেকে যমুনাসেতু পর্যন্ত চার লেন আর যমুনা সেতু হলো দুই লেনের। এই মহাসড়কে ২৪টি জেলার পরিবহনে হাজারও মানুষ নিয়মিত যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহন করে থাকেন। এছাড়া টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল-জামালপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের চলাচলকারি যানবাহনও এলেঙ্গায় এসে যুক্ত হয় এই মহাসড়কে। মহাসড়ক ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পরিবহনের চাপে এমনিতেই যাত্রিসাধারণের কমবেশি ভোগান্তি লেগেই থাকে। ঈদ এলে এই ভোগান্তি দূর্ভোগে পরিণত হয়। বাড়িত গাড়ীর বিশাল বহর টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত আসার পর ধীরে ধীরে সরু সড়কে প্রবেশ করতে করতে গাড়ির সাড়ি লম্বা হয়ে থাকে। বুধবার ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনাসেতু মহাসড়কে গিয়ে দেখা যায়, চন্দ্রা থেকে সকল পরিবহন নির্বিঘ্নে এলেঙ্গা পর্যন্ত পৌঁছতে পারছে। এলেঙ্গায় এসেই গাড়ির গতি ৫ থেকে ০ কিলোমিটারে নামাতে বাধ্য হচ্ছেন চালকরা। অত্যন্ত ব্যস্ত এই মহাসড়কের এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের ফ্লাইওভারে নির্মাণযজ্ঞ ঝুকিমুক্ত করার জন্য টিনের বেস্টনি করা হয়েছে। ফলে ২৬ মিটার প্রস্থ সড়কটির ১০ মিটারে সংকুচিত হয়ে গেছে। ওই বেস্টনির পূর্ব ও পশ্চিম দিয়ে একলেনে যানবাহন চলাচল করছে। এরই মাঝে যাত্রি পারাপার ও বাসে যাত্রি উঠানামাও চলছে। যারকারণে গাড়ির গতে কমছে। অনেক সময় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে ৩শ গজ সামনেই টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ-জামালপুর আঞ্চলিক মহসড়কের চলাচলকারি যানবাহন হাইওয়েতে যুক্ত হতেই উত্তরবঙ্গের যানবাহন থামাতে হচ্ছে। ফলে এখানেও যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ওই সংযোগ সড়ক থেকে আধকিলোমিটার এগোলেই ভূঞাপুর সংযোগ সড়কে নির্মিত হচ্ছে আন্ডারপাস। সেখানে কাজ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে। আন্ডারপাস নির্মানের জন্য গর্তের দুইদিক দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। একই সাথে যুক্ত হচ্ছে ভূঞাপুর দিয়ে চলাচলকারি যানবাহন। যমুনাসেতু মহসড়কের এলেঙ্গা থেকে ১৩কিলোমিটার চার লেনে উন্নীত করনের কাজ চলমান। কিছু কিছু স্থানে কাজ শেষ হলেও পরিবহন চলাচলের উপযোগি হয়নি। ব্যস্ত এই মহাসড়কের যে স্থানগুলো নির্মান শেষ হয়েছে সেই স্থানে ধান ও খড় শুকাতেও দেখা গেছে এলাকা ঘুরে। কিছু কিছু স্থানে পানি জমে নালায় পরিণত হয়ে আছে। শ্রমিকরা জানিয়েছেন বৃষ্টি এলেই নির্মান কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুনরায় পানি সেচ দিয়ে সড়ক নির্মান কাজ করতে হয়। চারলেনে উন্নীতকরণের চলমান কাজের দুইধার দিয়ে বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচল করছে। পরিবহন চালকদের ওভারটেকিং এর অসুস্থ্য প্রতিযোগিতা দূর্ঘটনার শঙ্কা বাড়াচ্ছে। আর দূর্ঘটনা ঘটলেই মাইলের পর মাইল যানজট দেখাদেয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রাজশাহীর চাকুগাও গ্রামের বাসিন্দা ইউসুব জানান, ফ্লাইওভারের কাজ শেষ না হওয়া তুরি ভোগান্তি থাকবোই। যত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ হবো তত তাড়াতাড়ি ভোগান্তি শেষ হবো। নির্মান শ্রমিক বিনোদ মিয়া বলেন, ঢালাই করে চাললেনের সড়ক নির্মান কাজ চলমান রয়েছে। তবে বৃষ্টি আমাদের ভোগাচ্ছে। পানি সেচে ঢালাই করার জন্য রড বিছিয়ে প্রস্তুত করা হয়। আবার বৃষ্টি এসে সব ডুবে যায়। ফলে কাজও পিছিয়ে যায়। জোকার চরের সিদ্দিক হোসেন জানান, মহাসড়কে যানজটের প্রধান কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত যানবাহন। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ১০ থেকে ১২ হাজার যানবাহন চলাচল করে। ঈদের সময় সেখানে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। অপরদিকে বাসস্ট্যান্ডে নির্মান কাজের জন্য রাস্তা চাপা হওয়ায় গাড়ির গতি কমেও যানজট লম্বা হয়। বাস চালক সোহেল মিয়া বলেন, অতিরিক্ত যানবাহন চলাচলের সময় ফিটনেসবিহীন গাড়ি বিকল হলে বা দূর্ঘটনার শিকার হলে যানজট দেখা দেয়। বিকল যানবাহন সরাতেই আধা ঘন্টা চলে গেলে তাৎক্ষণিক মহাসড়কে প্রায় ২০/৩০ কিলোমিটার যানজট হয়ে যায়। অপরদিকে মহাসড়কের পাশে কোরবানি পশু বোঝাই ট্রাক লোড আনলোড করা ও কোরবানির হাট বসানোর কারণেও যানজট হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আবদুল মোমেন লিমিটেডের প্রজেক্ট ম্যানেজার রবিউল আওয়াল বলেন, চারলেনে উন্নীত করন কাজের আওতায় আমাদের প্রকল্পে আটটি ব্রীজ ১০ টি কালভার্ট, ৩টি আন্ডারপাস ও একটি ফ্লাইওভার রয়েছে। ব্রীজ ও কালভার্ট নির্মান শেষ হয়েছে। ফ্লাইওভারের পাইলিং এর কাজ শেষের দিকে। সব মিলিয়ে ৫০ পার্সেন্ট কাজ শেষ হয়েছে। আমাদের কারণে কোন ভোগান্তি দেখা দেবেনা। আমরা যেখানে কাজ করছি সেখানেই দুই পাশে যানবাহান চলাচলের উপযুক্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছি। যমুনা সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্বরত কর্মকর্তা সহকারি প্রকৌশলী শেখ ফরিদ বলেন, ঈদযাত্রায় যাতে মানুষের কোন ভোগান্তি না হয় সে জন্য সেতুর দুই প্রান্তে ৯টি করে ১৮টি বুথে টোল আদায় ও যানবাহন পারাপার হবে। মোটরসাইকেলের জন্য ২টি করে আলাদা বুথ থাকবে। অপরদিকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন বলেন, আমরা যান চলাচল নির্বিঘ্ন করা এবং ঈদযাত্রায় ভোগান্তি লাঘবের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। যেখানে যেখানে যানজটের শঙ্কা রয়েছে সেখানে আমরা রাস্তাকে প্রশস্ত করেছি। আবার যেখানে কাজ দ্রুত করা প্রয়োজন সেখানে গতি বাড়িয়েছি। যান চলাচল নির্বিঘ্ন করার জন্য ঈদের আগে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার শামসুল আলম সরকার বলেন, টাঙ্গাইল জেলার ৬৫ কিলোমিটার হাইওয়েতে ৬০টি পয়েন্টে মোটরসাইকেল টিমসহ পুলিশী ডিউটি রাখা হয়েছে। এই মহাসড়ককে ৫টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। এখানে ৮শতাধিক পুলিশ কাজ করবে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপারগণ ওই সেক্টরগুলোর দায়িত্বে থাকবে। এই মহাসড়কে রাস্তার চেয়ে পরিবহন বেশি থাকবে। পাম্পগুলোতে তেল বা গ্যাস নেওয়ার সময় লাইন সড়কে এসে যাতে যানজট সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে তদারকি রাখা হচ্ছে। ফ্লাইওভার নির্মান কাজ চলমান থাকার কারণে যানজট সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সেখানে যেন যত্রতত্র যানবাহন দাড়িয়ে থেকে জট সৃষ্টি করতে না পারে সেব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা হবে। ব্রীজে যদি কোন গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয় তাহলে যানজটের শঙ্কা রয়েছে। আমরা তারজন্য ব্রীজের কাছাকাছি রেকার রাখার ব্যবস্থা করেছি। বিবিএ কর্তৃপক্ষের সাথেও আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকবে। যাতে করে কোথাও ঈদযাত্রায় কারও কোনো বিঘ্ন না ঘটে।