ছবির ক্যাপশন:
টাঙ্গাইলের মধুপুরে একুশে পদক প্রাপ্ত শেকড় সন্ধানী গুণী শিল্পী লোকমান ফকিরের ৩৫ তম শাহাতদ বার্ষিকীতে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত। লোকমান ফকির গীতিকার , সুরকার , কবি , চলচিত্রাকার নানা গুণে গুণান্বিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা ( জাসাস ) এর প্রতিষ্ঠিতা সভাপতি ছিলেন।
বৃহস্পতিবার ২৩ এপ্রিল জাসাস মধুপুর উপজেলা শাখার আয়োজনে মধুপুর জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির কার্যালয়ে এ আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। জাসাসের মধুপুর উপজেলা শাখার সভাপতি আবু সাইদের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন সরকার।
অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন , উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি এম রতন হায়দার , গোলাবাড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির , পৌর বিএনপির সহ সভাপতি , আনোয়ারা খন্দকার লিলি সরকার , পৌর বিএনপির আব্দুল লতিফ পান্না, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক ওবায়দুল্লাহ , সাংগঠনিক সম্পাদক ফরহাদুল ইসলাম , জাসাসের মধুপুর শাখার নেতৃ বৃন্দ, উপজেলা মহিলা দলের নেতৃবৃন্দ সহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।
অনুষ্ঠান টি সঞ্চালনা করেন জাসাস মধুপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম রনি।
আলোচনা সভায় বক্তারা মাটি ও মানুষের সুরসারথি লোকমান ফকিরের জীবন ও সৃষ্টি বিষয়ে আলোচনা করেন।
বাংলার লোকসংগীতের কথা উঠলে যে ক'জন কালজয়ী শিল্পীর নাম অবধারিতভাবে চলে আসে, লোকমান ফকির তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কেবল একজন কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং যন্ত্রশিল্পী। শেকড় সন্ধানী এই গুণী শিল্পীর জীবন ও কর্মজীবন ছিলো অনবদ্য।
মরমী সাধক এই শিল্পী তাঁর দীর্ঘ সংগীত জীবনে হাজার হাজার গান রচনা করেছেন। তাঁর গানে ফুটে উঠেছে গ্রামীণ জীবন, আধ্যাত্মিকতা এবং বাংলার সহজ-সরল মানুষের সুখ-দুঃখের কথা।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক (২০০৩) প্রদান করে। এটি ছিল তাঁর দীর্ঘ ত্যাগের ও সাধনার প্রতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা।
একুশে পদকপ্রাপ্ত গুণী শিল্পী লোকমান হোসেন ফকির বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলার সন্তান।তিনি ১৯৩৪ সালের ২২ অক্টোবর ভূঞাপুর উপজেলার নিকরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নিকরাইলের বিখ্যাত 'ফকির পরিবারে' তাঁর জন্ম।
সৃজনশীল কৃতিত্বের দিগন্ত লোকমান ফকির বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। গীতিকবি ও সুরকার হিসাবে তিনি প্রায় চার হাজারের বেশি গান লিখেছেন ও সুর করেছেন। তাঁর গানের ভাষা যেমন সহজ, সুর তেমনি হৃদয়স্পর্শী। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তিনি লোকসংগীতকে পৌঁছে দিয়েছেন ড্রয়িংরুম থেকে দূরপ্রান্তের গ্রামগুলোতে।
চলচ্চিত্রের সংগীতেও তাঁর পদচারণা ছিলো। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের চলচ্চিত্রে তাঁর সংগীত পরিচালনা ও কণ্ঠদান ছবিগুলোকে অন্যমাত্রা দিয়েছিলো।তিনি কেবল গায়ক ছিলেন না, দোতারা ও হারমোনিয়ামের বাদনেও ছিলো তার পদচারণা।
তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে , " আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা" "ওরে আমার মন-ভোলা মন" , "পাখিটা বন্দি আছে দেহের খাঁচায়" ' "ও দয়াল তোর নামের ভরসায়"।
লোকমান ফকিরের গানে দেহতত্ত্ব এবং মরমী দর্শনের প্রবল প্রভাব পাওয়া যায়। তিনি মনে করতেন, সুরের মাধ্যমেই স্রষ্টা এবং সৃষ্টির সেতুবন্ধন তৈরি সম্ভব। তাঁর বিনয়ী জীবনযাপন এবং অনাড়ম্বর ব্যক্তিত্ব তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে 'ফকির' হিসেবে অনন্য মর্যাদা দিয়েছিলো।
"লোকমান ফকিরের গান শুধু বিনোদন নয়, এ যেন এক আধ্যাত্মিক যাত্রা। তাঁর প্রতিটি চরণে মিশে আছে বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধ।"
আজকাল যখন লোকসংগীতের নামে ফিউশন বা সুরের বিকৃতি নিয়ে নানা আলোচনা হয়, তখন লোকমান ফকিরের মতো শুদ্ধ সাধকদের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি অনুভূত হয়। নতুন প্রজন্মের সংগীতপ্রেমীদের লোকমান ফকিরের সৃষ্টি ও জীবনদর্শন সম্পর্কে অবহিত করা । তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ও সুর কোটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।