নতুন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে আসছে বই। আজ বিশ^ বই দিবস। পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি ও জ্ঞানচর্চায় বইয়ের সাথে যুক্ত করতে কাজ করছে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা। সেই থেকে একদম ভিন্ন আঙ্গিকে দেশজুড়ে সমাদৃত হয়েছেন ‘হারুন পাঠাগার।’ চায়ের দোকানে স্কুল-কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ দেশবরেণ্য মানুষের প্রিয় প্রাঙ্গন হয়ে উঠেছে। চায়ের গরম চুমুকে, পাতায় পাতায় যেনো খোঁজে পাঠক তার প্রিয়তাকে। উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকারী গ্রন্থগারিক পদ ও পাঠাগার থাকলেও সেখানে জমছে ধুলোর আস্তরণ। এক্ষেত্রে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতায় পাঠকের দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছেন এই চা বিক্রেতা।
বিশ^খ্যাত সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়রের জন্ম ও মৃত্যু, মিগুয়েল ডি সার্ভান্তেসের মৃত্যু এবং ইনকা গারসিলাসো দে লা ভেগার মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে আজকের এই বই দিবস।
‘মাদক ছাড়ুন-চা ধরুন, বইপড়ুন’ স্লোগানে চায়ের দোকানে গড়ে তোলেন ‘হারুন পাঠাগার’। হারুন মিয়া ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরের সতিষা গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বারের পুত্র। অভাবের তাড়নায় উচ্চ বিদ্যালয়ে গণ্ডি আটকে যায় লেখাপড়া শুরু করেন চা বিক্রি। চা বিক্রির টাকায় পাঠাগার গড়ে নিজ এলাকায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি। এ দিবসটি পালন উপলক্ষ্যে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, বইপড়া প্রতিযোগিতা, বই বিতরণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
দরিদ্র হারুন মিয়া (২৭)। সংসার ও নিজের পড়াশোনা চালাতে অন্যের দোকানের এক কোনায় টেবিল পেতে চা বিক্রি শুরু করেন। চায়ের টেবিল দৈনন্দিন পত্রিকার সঙ্গে প্রথমে নিজের টাকায় কিছু বই কিনে চা প্রেমিদের পড়ার সুযোগ করে দেন। এরপরে ব্যাপক সাড়া পড়ায় তিনি এ ব্যাপকতা আরও বাড়ান। তার এ পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা ৫শতাধিক। প্রতিদিন জাতীয় ও স্থানীয় ১২-১৪টি পত্রিকা রাখেন তিনি।
এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৪সনে পেয়েছেন ‘প্রিয় বাংলা পাঠাগার’ পদকে। প্রিয় বাংলা প্রকাশনীর উদ্যোগে শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চা বিক্রেতা হারুন মিয়াকে এ পুরস্কারে ভূষিত করেন। নাট্যাভিনেতা আবুল হায়াত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত হয়ে পুরস্কারের সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেন। পাঠাগার গড়ে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর স্বীকৃতিস্বরূপ হারুন ছাড়াও দেশের আরো তিন ব্যক্তিকে এই পুরস্কার দেওয়া হয় প্রিয় বাংলা প্রকাশনীর পক্ষ থেকে। এ ছাড়া পুরস্কৃতদের প্রত্যেকের হাতে ২০০ বই তুলে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে হারুন মিয়া বলেন, ‘আমি অতি ক্ষুদ্র একজন মানুষ। কিন্তু যে সম্মান আমাকে দেওয়া হয়েছে তা বহন করার ক্ষমতা আমার নেই। বই পড়ার নেশা থেকে আমি আজেবাজে টাকা খরচ না করে বই কিনে আনি। আর তা আমার চা স্টলে রাখি চাপ্রেমীদের পড়ার জন্য। গড়ে তুলি পাঠাগার।’ এ প্রসঙ্গে গৌরীপুর গণপাঠাগারের নির্বাহী পরিচালক আমিরুল মোমেনীন বলেন, হারুন পাঠাগার দৃষ্টান্তস্থাপন করেছে। এ রকম উদ্যোগ সমাজের অপসংস্কৃতিকে দূরে ঠেলে আলোর সন্ধান দেয়। হারুন পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক শ্যামল ঘোষ বলেন, আজকের ডিজিটালযুগে চায়ের সঙ্গে বইপড়া আর পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
জানা যায়, হারুন মিয়া আয় রোজগারের আশায় ২০১২ সালে বেছে নেন চায়ের দোকান। ২০২৩ সালে চা বিক্রির টাকায় গড়ে তোলেন পাঠাগার। চা দোকানী মো. হারুন মিয়া বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ের অধিনে ২০২৩সনের ২২ ডিসেম্বর প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রী (অনার্স) কলেজ টিউটোরিয়াল সেন্টার থেকে জিপিএ-২.৫৯ গ্রেড পেয়ে উর্ত্তীণ হয়েছেন। হারুন একই বিশ^বিদ্যালয়ের অধিনে ২০২২সনে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ফলাফলে জিপিএ- ২.৮৬ পেয়ে এসএসসি পাশ করেন। বর্তমানে বিএ অধ্যয়নরত। ডিজিটাল দুনিয়ায় ‘হারুন টি স্টল’ ব্যতিক্রমী আয়োজনে দেশেজুড়ে এখন আলোচিত। তার অদম্য ইচ্ছেশক্তির গল্পও নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্ধেক দামে চা, সেরা চা গ্রাহককে সম্মাননা ও মাদক বিরোধী প্রচারণায় নেমে তিনি প্রশংসিত হন।