ফজলে হাসান ভালুকা (ময়মনসিংহ) থেকে
একসময় জীবিকার জন্য বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসায় ইমামতি করতেন হাফেজ রোকনউদ্দিন। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে গাছ লাগানো ছিল তাঁর নেশা। মসজিদ, মাদরাসা ও বাড়ির আঙিনায় নানা জাতের ফলের গাছ রোপণ করতেন তিনি। সেই শখই একসময় তাঁকে নিয়ে আসে বাণিজ্যিক ফলচাষে। প্রায় আট বছর আগে মাত্র ৩০টি লটকনের চারা দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। আজ তাঁর দুটি বাগানজুড়ে প্রায় চার বিঘা জমিতে শত শত লটকনগাছ। ফল বিক্রির পাশাপাশি উন্নত জাতের কলম উৎপাদন করেও আয় করছেন তিনি। তাঁর বাগানে উদ্ভাবিত একটি উন্নত জাত এখন স্থানীয়ভাবে ‘নয়নপুরী লটকন’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
ভালুকা উপজেলার নয়নপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি লটকনগাছ ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলছে থোকায় থোকায় হলুদাভ পাকা লটকন। মৌসুম শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা বাগানে এসে ফলের দরদাম করছেন। আবার কেউ কেউ আসছেন শুধু উন্নত জাতের কলম কিনতে। স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি আশপাশের উপজেলা থেকেও অনেকে তাঁর বাগান দেখতে আসছেন।
রোকনউদ্দিন বলেন, 'পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘদিন বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসায় ইমামতি করেছি। তখন থেকেই গাছের প্রতি আলাদা টান ছিল। প্রথমে বিভিন্ন ফলের গাছ লাগাতাম। পরে জানতে পারি, লটকন একটি লাভজনক ফল। তখন ২০১৮ সালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলা থেকে ৩০টি চারা কিনে প্রথম বাগান শুরু করি।'
তিনি জানান, 'পরে একটি পুরোনো বাগানসহ প্রায় ২০০টি গাছ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেন। কিন্তু শুরুতেই ধাক্কা খান। অনেক গাছ পুরুষ হওয়ায় প্রত্যাশিত ফলন পাননি। এরপর নিজেই কলম করার কৌশল রপ্ত করেন। ভালো ফলনশীল গাছ নির্বাচন করে নতুন করে কলম তৈরি করেন এবং উন্নত জাতের বাগান গড়ে তোলেন।'রোকনউদ্দিন বলেন, 'গত আট বছরে ৮ থেকে ১০টি জাত নিয়ে কাজ করেছি। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দুটি জাতকে সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাতের ফল বড়, খেতে খুব মিষ্টি, বাজারে চাহিদাও বেশি।'
এই জাতটির নামকরণের পেছনেও রয়েছে একটি গল্প। তিনি জানান, কৃষিভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান হৃদয়ে মাটি ও মানুষ-এর উপস্থাপক শাইখ সিরাজ একসময় তাঁর বাগান পরিদর্শনে আসেন। উন্নত জাতটির ফল দেখে তিনি গ্রামের নাম অনুসারে ‘নয়নপুরী লটকন’ নাম রাখার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই স্থানীয়ভাবে এ নামেই পরিচিতি পেয়েছে জাতটি।বর্তমানে চার বিঘা জমির দুটি বাগানে তাঁর লটকনের চাষ হচ্ছে। ফল বিক্রির পাশাপাশি উন্নত জাতের কলম উৎপাদন এখন তাঁর আরেকটি আয়ের উৎস। এক বছরের কলম বিক্রি হয় ১০০ টাকায়। দেড় থেকে দুই বছরের কলম বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। প্রতিবছর বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক ও উদ্যোক্তারা তাঁর বাগানে এসে কলম কিনে নিয়ে যান।
রোকনউদ্দিন বলেন, 'আমি সব সময় চেষ্টা করি ভালো মানের কলম দিতে। ভালো জাতের চারা না হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই পরীক্ষিত গাছ থেকেই কলম তৈরি করি।'লটকন চাষকে সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'এটি স্বল্প পরিচর্যার একটি ফল। গর্ত করে উন্নত জাতের কলম রোপণ করলেই হয়। এরপর খুব বেশি খরচ নেই। চার থেকে পাঁচ বছর পর গাছে ফল আসে। গাছ যত বড় হয়, ফলনও তত বাড়ে। ফল আসার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক স্প্রে করলে ফলের রং ও মান ভালো থাকে। তবে প্রতিবছর আবাদি জমিতে এ চাষ উপযোগী নয়। পতিত বা অনাবাদি জমিতে লটকনের বাগান করলে বেশি লাভবান হওয়া যায়।'
তিনি আরও বলেন, 'বাড়ির ছাদে বা টবে লটকনের বাণিজ্যিক চাষ সম্ভব নয়। এটি বড় গাছ হওয়ায় পর্যাপ্ত জায়গা প্রয়োজন।'বাগানের ফল গাছ থেকেই পাইকারি বিক্রি হয়ে যায়। বর্তমানে প্রতি মণ লটকন ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই তিনি প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। মৌসুম পুরোদমে শুরু হলে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছেন। নিজের বাগানের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি বাগানের লটকনও তিনি পাইকারিভাবে কিনে বাজারজাত করেন।
গফরগাঁও উপজেলা থেকে চারা কিনতে আসা মো. এনামুল হক বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোকন ভাইয়ের বাগান দেখেছিলাম। পরে সরেজমিনে এসে ফল খেয়ে দেখি সত্যিই খুব মিষ্টি। তাই ৩২টি কলম কিনেছি। বাড়ির পতিত জমিতে লাগাব। ফলন ভালো হলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান করব।'নয়নপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, 'আমি এই বাগান থেকে ১০০টি চারা নিয়েছি। রোকনের লটকনের ফল বড়, দেখতে সুন্দর এবং খেতেও অনেক মিষ্টি। তাই তাঁর চারার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে।'
স্থানীয় কৃষকদের মতে, কয়েক বছর আগেও এলাকায় লটকনের বাণিজ্যিক চাষ খুব একটা পরিচিত ছিল না। রোকনউদ্দিনের সাফল্যের পর অনেকেই এখন পতিত জমিতে লটকনের বাগান করার পরিকল্পনা করছেন। উন্নত জাতের কলম সহজলভ্য হওয়ায় এ অঞ্চলে লটকন চাষের পরিধিও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
একসময় যিনি মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে মানুষকে ধর্মীয় দিকনির্দেশনা দিতেন, আজ তিনি বাগানে দাঁড়িয়ে কৃষকদের দেখাচ্ছেন লাভজনক ফলচাষের পথ। শখ থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা এখন শুধু তাঁর নিজের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়, বরং এলাকার অনেক নতুন উদ্যোক্তার জন্যও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।#