আনোয়ার সাদাৎ ইমরান
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দীর্ঘ ২০ বছর পর চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিরোধী দল হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষিত হওয়ার পর রাজনীতির এই সমীকরণ দৃশ্যমান হয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর সরকার গঠন ও বিরোধী দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে বলে জানা গেছে।
২৯৯ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ২৯৭ আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। বিএনপি একক দল হিসেবে পেয়েছে ২০৯টি আসন এবং তার মিত্ররা পেয়েছে আরও ৩টি। সবমিলিয়ে তাদের জোটবদ্ধ আসন সংখ্যা ২১১টি। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই আসন যথেষ্ঠ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)৬টি আসন পেয়েছে। তাদের মিত্ররা পেয়েছেন আরও ৩টি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি এবং স্বতন্ত্র জয় পেয়েছেন ৭টি আসনে।
এই আসনগুলোর মধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুইটি আসনে জয়লাভ করেছেন। আসন দুটি হলো ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬। প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে উভয় আসনেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন তারেক রহমান।
এদিকে ঢাকা-১৫ আসনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিধি অনুসারে সরকার গঠনের জন্য ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫১টি আসনে জয়লাভের প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে বিএনপি এককভাবেই সরকার গঠনের সাংবিধানিক শর্ত পূরণ করেছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য ৩০০ আসনের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ আসনের ভোটের প্রয়োজন হয়। সেই দিক থেকেও পূর্ণতা রয়েছে বিএনপি ও তার মিত্রদের।
বিএনপির পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, দল সরকার গঠন করলে তারেক রহমানই হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।সর্বশেষ ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র প্রদান করলে সেই মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যান। দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এছাড়া ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য সরকার গঠন করেছিল বিএনপি।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত বছরের ২৫ নভেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান এবং ২৭ নভেম্বর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ১৯৯৩ সালে বগুড়ায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করে তৃণমূল রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
২০০২ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, এবারই প্রথমবারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। অতীতে তারা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে সরকার ও বিরোধী দলে থাকলেও এবার স্বতন্ত্রভাবে প্রধান বিরোধী শক্তির মর্যাদা পেতে যাচ্ছে। জামায়াতের আমীর ডা. মো. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে এবং তার আকর্ষণীয় নেতৃত্ব দেশজুড়ে বিপুল পরিমাণে ভোট বেড়েছে দলটির। তারা এর আগে সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন লাভ করেছে। এছাড়া তাদের শরীক দল এনসিপি ৬টি আসন পেয়েছে। তাদের মিত্ররা পেয়েছেন আরও ৩টি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি এবং স্বতন্ত্র জয় পেয়েছেন ৭টি আসনে।