‘ঘাটাইলে সার আছে, সার নেই’ গত ৪ আগষ্ট সমকালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ইউএনও তাঁর বক্তব্যে বলেন উপজেলায় সারের সংকট আছে। অপরদিকে কৃষি কর্মকর্তা বলেন সারের কোনো সংকট নেই। সার নিয়ে দুই কর্মকর্তার এমন বক্তব্যে সমকালের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। উভয় কর্মকর্তার বক্তব্যেই সঠিক। বিসিআইসি এবং বিএডিসি ডিলার প্রতি সরকারিভাবে সারের বরাদ্দ থাকলেও ছিঁটেফোঁটাও জোটেনা খুচরা ডিলারদের ভাগ্যে। যার ফলে ঠিকমতো সার পাচ্ছেন না কৃষক। দাম দ্বিগুণ।
উপজেলায় বিসিআইসি সারের ডিলারের সংখ্যা ১৮ জন এবং বিএডিসি ডিলার রয়েছে ২০ জন। সরকারিভাবে ডিলার প্রতি বিভিন্ন ধরনের সারের যে বণ্টন করা হয় তার পরিমাণ প্রায় একই। প্রতিটি ইউনিয়েনের প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে খুচরা ডিলার নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বিসিআইসি ডিলারদের থেকে সার নিয়ে বিক্রি করবেন খুচরা ডিলাররা। কিন্তু খুচরা ডিলারদের অভিযোগ এক ছটাক সারও তাদের জোটেনা। তাহলে ডিলারদের বরাদ্দ দেওয়া সার যায় কোথায়? আর খুচরা ডিলাররা সার পান কোথায়? খুচরা ডিলারদের ভাষ্য বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার ক্রয় বিক্রি করেন তারা।
৫ নভেম্বর উপজেলার সাগরদীঘি ইউনিয়নের সাগরদীঘি বাজারের ১৬ জন খুচরা সার ও কিটনাশক ব্যবসায়ী সঞ্জয় সাহা ও বিসিআইসি সারের ডিলার রাজীব এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়-রাজীব এন্ডারপ্রাইজ সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সার ছাড়াও বিপুল পরিমাণ সার অবৈধভাবে সাগরদীঘি বাজারের বাঘাড়া রোডে একটি গোডাউনে সংরক্ষণ করে বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু খুচরা ডিলারদের তিনি এক বস্তা সারও দেন না। সঞ্জয় সাহা বিভিন্ন কম্পানির কিটনাশক ডিলার বিহীন এবং কতৃত্বপত্র ছাড়াই অবৈধভাবে বিক্রি করে থাকেন। বিক্রি করেন বিভিন্ন কম্পানির ভেজাল কিটনাশক। ফলে জমি তার উর্বরতা হারাচ্ছে।
সাগরদীঘি বাজারের বিসিআইসি খুচরা ডিলার আশোক চন্দ্র মন্ডল বলেন, প্রতি মাসেই বিসিআইসি ডিলাররা সার বরাদ্দ পান, কিন্তু আমরা পাইনা। সাত বছরের মধ্যে মাত্র একবার কিছু সার পাইছি। তাও শুধু ইউরিয়া, অন্য কোনো সার দেওয়া পাই নাই। শহিদুল ইসলাম নামে একজন ডিলার বলেন, ছয় বছরের মধ্যে এক ছটাকও সার পাই নাই। ডিলার রাজীব এন্টারপ্রাইজের কাছে গেলে বলে ডিও পাই নাই। অথচ ঘরে সার থাকতেও ডিলার সার দেয়না। বারবার সারের জন্য গেলে ডিলার বলে এই সার বরাদ্দের সার না, অন্য জায়গা থেকে কেনা। তিনি আরও বলেন ঘাটাইরে জন্য বরাদ্দতৃক সার আমাদের না দিয়ে তিনি ওই সার বেশি দামে প¦ার্শবর্তী ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলাতে বিক্রি করেন।
এ বিষয়ে রাজীব এন্টারপ্রাইজের রাজীব সাহা বলেন, আমার নামে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন। আমি বাহিরের উপজেলায় সার বিক্রি করি না। আমার কোনো গোপন গোডাউন নেই।
সঞ্জয় সাহা বলেন, আমি কয়েকটি কম্পানির ডিলার সেই কম্পানির কিটনাশক বিক্রি করি এবং ডিলার ছাড়াও কিছু কছিু কিটনাশক কম্পানির প্রতিনিধি আমাকে কিটনাশক দিয়ে যায় সেগুলো বিক্রি করি।
জেলার বৃহৎ উপজেলা ঘাটাইল। ১৪ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে ধলাপাড়া, সাগরদীঘি, লক্ষিন্দর, রসুলপুর ও সন্ধানপুর ইউনিয়নগুলোর মাটির রঙ লাল। লাল মাটিতে সোনা ফলে। ব্যাপকভাবে চাষ হয় কলা, ড্রাগন, পেঁপেঁ এবং হলুদ। এ বছর যোগ হয়েছে আখের আবাদ। কৃষকরা জানায় এ ধরনের ফসল ফলানোর জন্য এলাকাগুলোতে সারের চাহিদা অনেক বেশি। অন্যান্য সারের মধ্যে টিএসপি সারের চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি। টিএসপি মাটির ফসফরাসের ঘাটতি পূরণ করে। ফসফরাস গাছের শিকড় মজবুত করে, সময়মতো ফুল ফোটায়, ফসল পাকায় এবং গুণগত মান বাড়ায়। যার কারণে কৃষকের অভিযোগ এই সার সরকার নির্ধারিত দামে তারা পাচ্ছেন না। কিনতে হচ্ছে দ্বিগুন দামে। তাদের দাবী দোকানে সাঁটানো সরকারি মূল্য তালিকা নিছকই লোক দেখানো। কৃষক রাজিবুল ইসলাম বলেন, খুচরা ডিলারদের কাছে সার কিনতে গেলে তারা বলেন সার নেই। ডিলারদের কাছে কিনতে গেলে বলে সার নেই। তাহলে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সার যায় কোথায়? কৃষকদের অভিযোগ ডিলারদের দোকানে সার পাওয়া যায় না, তবে গোপন গোডাউনে সারের অভাব নেই। দাম দ্বিগুণ। এই কথার সূত্র ধরে গত ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় সাগরদীঘি বাজারে অবস্থান করেন এই প্রতিবেদক। মা ট্রেডাসের মালিক মর্তুজ আলী বিএডিসি ডিলার। সাগরদীঘি বাজারে ঘাটাইল রোডে তার দোকান। পরিচালনা করেন তার ছেলে আমিনুল ইসলাম। সখীপুর রোডে রয়েছে তার গোপন সারের গোডাউন। গোডাউন থেকে সার বিক্রির সময় কথা হয় ক্রেতা মো. আলমগীরের সঙ্গে। তিনি বলেন টিএসপি সার ক্রয় করলেন প্রতি বস্তা দুই হাজার ৪৮০ টাকা দিয়ে। অথচ সরকারিভাবে এই সারের ৫০ কেজির প্রতি বস্তার মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৩৫০। মা ট্রেডাসের পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি সরকারি দরে সার বিক্রি করি, বাড়তি দামে কোনো সার বিক্রি করি না।
কৃষকদের দাবী সরকার নির্ধারিত দামে সার কিনতে পারলে প্রতিমাসে তাদের নূন্যতম ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা বেঁচে যেত। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার তদারকি নেই।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিলশাদ জাহান বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত সারের দোকানগুলো মনিটংি করছি। খুচরা বিক্রেতারা ডিলারদের থেকে সার পাচ্ছেন। উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকরা বেশি দাম দিয়ে সার কিনেছেন এমন অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর খুচরা ডিলারদের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.আবু সাঈদ সমকালকে বলেন, উপজেলায় সারের সংকটের কথা বিবেচনা করে রেজুলেশন করে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। আর খুচরা ডিলারদের করা অভিযোগের কপি পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বিষয়টি দেখার জন্য বলা হয়েছে।