টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে অনিয়ন্ত্রিত মাটি কাটার ফলে ধ্বংস হচ্ছে কৃষি জমি, চলাচলের রাস্তা ও হুমকির মুখে পড়ছে বসতবাড়িও। এই অনিয়ন্ত্রিত মাটি কাটার ফলে বিধবা এক নারী তার শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর শঙ্কায় চোখের জলে দিন পার করছেন।
বিধবা ওই নারীর নাম সাহারা খাতুন। তার বাড়ি মির্জাপুর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের টাকিয়াকদমা সিতারচালা গ্রামে।
গত এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টির ফলে ঘরের পাশ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। পলিথিন দিয়ে ঢেকে বাঁশ দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হচ্ছেনা। রাতে ঠিকমত ঘুমাতেও পারছেন না। শুধু মনে হয় এই বুঝি ঘর পড়ে যাবে।
জানা যায়, ওই গ্রামের মৃত ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী সাহারা খাতুন (৭০)। দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। বড় ছেলে আনোয়ার হোসেন অন্যত্র বাড়ি করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। ছোট ছেলে আনিসুর রহমান গোড়াই শিল্প এলাকায় স্কয়ার ফার্মাসিটক্যালে ছোট পদে চাকরি করেন। তিনি বিয়ে করে শশুড় বাড়িতে থাকেন। একমাত্র মেয়ে মজিরন স্বামীর সংসারে সুখ না হওয়ায় মায়ের সঙ্গেই থাকেন। ছোট ছেলে আনিস প্রতিমাসে যা টাকা দেন তাদিয়ে ময়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে কোন রাকমে দিন পার করেন।
সাহারা খাতুনের বাড়ির পূর্বপাশ ঘেষে প্রায় ১০ ফুট নিচে প্রতিবেশি হযরত আলীর ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ জমি। সেই জমি বিক্রি করেন পার্শ্ববর্তী বরদাম গ্রামের অশিত চন্দ্রের নিকট। গত ৪ থেকে ৫ বছর আগে অশিতের মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা বাছেদ মিয়াসহ কয়েকজন মাঠি ব্যবসায়ীর নিকট ওই জমির মাটি বিক্রি করেন। মাটি ব্যবসায়ীরা ওই জমির মাটি ভেকু দিয়ে কেটে নেওয়া শুরু করেন। মাটি ব্যবসাায়ীরা এক ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা না রেখে মাটি কাটতে থাকলে সাহারা খাতুনের স্বামী সন্তানরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের কথার কোন কর্নপাত করেননি। মাটি কেটে নেওয়ার ফলে ওই জমিটি এখন সাহারা খাতুনের ঘর থেকে অন্তত ১৫ থেকে ১৬ ফুট নিচু হয়ে যায়। হুমকির মধ্যে পড়ে ঘরটি। তৎকালীন ক্ষমতাশীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় থেকে মাটি ব্যবসায়ীরা এসব কাজ করেছে বলে তাদের সামনে কথা বলার সাহস করতে পারেনি কেউ। এই ঘটনার কিছুদিন পর সাহারা খাতুনের স্বামী ইসমাইল মারা যান।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘর রক্ষার চিন্তায় সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকতেন ইসমাইল হোসেন। এই দুশ্চিন্তা থেকেই তিনি মারা যান।
সাহারা খাতুন বলেন, ঘরের চিন্তায় রাতে ঠিকমত ঘুমাতে পারিনা। মনে হয় ঘুমের মধ্যে ঘর পড়ে যাবে। এই ঘর রক্ষার জন্য বাছেদ মিয়াসহ মাটি ব্যবসায়ীদের হাতে পায়ে ধরেও কোন লাভ হয়নি। তারা তাদের ইচ্ছেমতো মাটি কেটে নিয়েছে। এখন আমার শেষ আশ্রয়টুকু কোন সময় যেন হারিয়ে যায়। নতুন কোন ঘর নির্মাণ করার সামর্থ আমার নেই।
প্রতিবেশি ইউসুফ খান বলেন, এভাবে কেউ মাটি কাটে কোথাও দেখিনি। এক ইঞ্চি জায়গা রাখেননি মাটি কাটার সময়। এটা কোন সুস্থ মানুষের কাজ নয়।সাহারা খাতুনের মেয়ে মজিরন বেগম বলেন, স্বামী সংসারে সুখ না হওয়ায় মায়ের সাথে থাকি। যদি এই ঘরটিই না থাকে তাহলে মাকে নিয়ে আমি কোথায় গিয়ে দাড়াবো।
লতিফপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী হোসেন রনি জানান, আমি চেয়ারম্যান হওয়ার আগে এই মাটি কাটার ঘটনা ঘটেছে। আমি ওই বাড়িতে গিয়ে দেখেছি। এটা একটি অমানবিক কাজ হয়েছে।
মির্জাপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) তারেক আজিজ বলেন, মানবিক দিক বিবেচনা করে ওই অসহায় নারীর খোঁজ নিয়ে সহায়তা করা হবে।