ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত শত বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঝলমল সিনেমা হলে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর/২৬) রাতে অগ্নিকাণ্ডে ঝলমল সিনেমা হলের প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ও নাট্যমন্দিরের আর্কিটেকচারভিউ ভস্মীভূত হয়েছে। এছাড়াও ভস্মিভূত হয় চারটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও ক্ষতিগ্রস্থ হয় ১১টি বিপনী বিতান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিবেশীরা জানায়, রাত ২টার দিকে পৌর কমিউনিটি পুলিশ ও আশপাশের লোকজন আগুন দেখতে পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও ব্যবসায়ীদের খবর দেন। আগুনের লেলিহান শিখায় ঝলমল সিনেমা হলের ভিতরে তানভীর এলপিজি স্টোরের গ্যাসসিলিন্ডারের গোডাউন, তাজ উদ্দিন ভূট্টোর ফার্নিচার উৎপাদন কেন্দ্র, বকুল মিয়ার বিদ্যুৎ মালামালের দোকান ও সুরুজ মিয়ার পুরাতন বস্তার দোকান ভস্মিভূত হয়। এসময় সিনেমা হলের সামনের ফল দোকান ও রাস্তার পাশের ১০টি দোকান মালামাল সরাতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তানভীর এলপিজি স্টোরের পরিচালক তানভরি আহমেদ জানান, গ্যাসসহ ২৫০টি বোতল, খালি ৭শ বোতল, ক্যাশে থাকা প্রায় লক্ষাধিক টাকাসহ প্রায় ৩০লাখ টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তাজ উদ্দিন ভূট্টো জানান, ফার্ণিচার উৎপাদন কেন্দ্রের প্রায় ৫০লাখ টাকার মেশিন ও ৬০লাখ টাকার উপকরণ ভস্মিভূত হয়েছে। অপর ২টি দোকানে প্রায় ১৫লাখ টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
খবর পেয়ে গৌরীপুর ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর কবিরুল আলমের নেতৃত্বে গৌরীপুরের ২টি, ঈশ^রগঞ্জ ও ময়মনসিংহের একটি করে ইউনিট প্রায় ২ঘন্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে তদন্ত কাজ চলছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফিয়া আমিন পাপ্পা জানান, তিনি সরজমিন পরিদর্শন করেছেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, যারা লিজ নিয়েছিলো তারা লিজের অনেক শর্তভঙ্গ করেছে। তাদেরকে ডেকেছিলাম, বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদনের কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলা হয়েছে।
লেখক রণজিৎ কর এর ‘গৌরীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থের আলোকে জানা যায়, লোক হিতৈষী জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর পুত্র বীরেন্দ্র কিশোর চৌধুরী শতাব্দীর ত্রিশ দশকের দিকে কলকাতা স্টার থিয়েটার হলের অনুকরণে নয়ন ভোলানো এক অনন্দ্যসুন্দর নাট্যমঞ্চ’ই আজকের ঝলমল সিনেমা হল। দেশ বিভাগের বিদায় ঘন্টার কারণে তাড়াহুড়ো করে এই মঞ্চে সর্বপ্রথম ‘শাহজাহান’ নাটক মঞ্চায়ন হয়। তৎকালের অত্যন্ত জনপ্রিয় ঐতিহাসিক অভিনেতা, উদ্যাক্তা বীরেন্দ্র কিশোরের পিতৃবন্ধু শিশির ভাদুড়ি ও অহীন্দ্র চৌধুরী অভিনয় করেন। দেশ বিভাগের পর বীরেন্দ্র কিশোরের নির্মিত সাধের নাট্যশালার কর্তৃত্ব পাকিস্তান সরকারের হাতে চলে যায়, কিছুদিন পর সেটা সিনেমা প্রদর্শনের জন্য ভাড়া দেয়া হয়। প্রথমে এর নাম ছিল ‘গিরি সিনেমা হল’, পরবর্তীতে প্রতিমা সিনেমা হল এবং বর্তমানে ‘ঝলমল সিনেমা হল’।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ঝলমল সিনেমা হলের ভিতরেই ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। যার কারণে ৭১’রে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় লীজগ্রহিতা কৃষ্ণলাল সাহাকে পাকিস্তানী দোসররা অপহরণ করে নিয়ে যায়। যিনি আজও ফিরে আসেননি। ৭১’র পরবর্তীতে এ সিনেমা হলটি আনোয়ারা বেগম, স্বামীমৃত- কাজী আশরাফ হোসেন, পিতা- মৃত আব্দুর রউফ চৌধুরী, মাতা- মৃত মাহমুদা খানম, বাড়ি নং ২৫, রোড নং ২৬, সেক্টর নং ৭, উত্তরা, ঢাকা ১২৩০ লীজ গ্রহণ করেন। তার কোন পুত্র ও কন্যা সন্তান ছিলো না। ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
এ দিকে ২০১৫ সালের ১৮ মার্চ ‘প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর অবহিত নয় এমন পুরাকীর্তি/প্রত্নস্থল’ উল্লেখ করে এক প্রতিবেদন দেন তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাউসার আজিজ। তিনি প্রতিমা হল যা বর্তমানে ঝলমল সিনেমা হলকে ‘একটি পুরাতন সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ’ বলে সংরক্ষণের দাবি জানান। গৌরীপুর মৌজার ৪১৫খতিয়ানের ২৪০৯নং দাগে ৮৮শতাংশ ভূমি নাট্যমন্দির শ্রেণিভূক্ত। এ প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত পোষণ করে তৎকালীন ইউএনও দূর-রে-শাহওয়াজ ওই বছরের ৮ এপ্রিল ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এর নিকট উনিঅ/গৌরী/২০১৫-২৯৫নং স্মারকে পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে ঐতিহ্যবাহী পুরাতন সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসাবে ডি.কে লাহিড়ীর বাড়ি, বীরঙ্গনা সখিনার মাজার ও যোগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর রামগোপালপুরের জমিদার বাড়ির বর্ণনাও তুলে ধরেন।
অপরদিকে লিজগ্রহিতা আনোয়ারা বেগমের মৃত্যুতে ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর ওয়ারিশান দাবি করে ১৬জন ভাতিজা নোটারী পাবলিকে এফিডেভিট ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রত্যয়ন গ্রহণ করেন। তারা হলেন মো. মহব্বত আলী চৌধুরী, মো. সাহাদাত ইসলাম চৌধুরী, মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, মো. আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, মো. ফজলে রহমান চৌধুরী, মো. আলী আজগর চৌধুরী, আলী আকরাম চৌধুরী, মো. আলী আহসান চৌধুরী, আবু বকর সিদ্দিক চৌধুরী, মো. আবু তালেব চৌধুরী, মো. সোলেমান ইসলাম চৌধুরী, মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরী, মো. আরিফুল ইসলাম চৌধুরী শুভ্র, মো. সাখাওয়াত হোসেন চৌধুরী, মো. মোস্তফা আহমেদ চৌধুরী ও নাবিল চৌধুরী।
২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে ঝলমল সিনেমা হলের সংলগ্ন ভূমিতে নিজ খরচে ঘর নির্মাণের জন্য ওয়ারিশানগন আবেদন করেন। এ আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই বছরের ৩ অক্টোবর ১৬জন ওয়ারিশানের প্রত্যেককে ১০০বর্গফুটের ১টি ঘর ও কাটাতারের বেড়া নির্মাণের অনুমোদন দেন। সেই অনুমোদন পত্রের ২নং শর্তাবলীতে ভূমির শ্রেণি ও ভৌগলিক পরিবর্তন করা যাবে না উল্লেখ থাকলেও ‘একটি পুরাতন সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ’ সংরক্ষণ বিষয়ে কোন দিকনির্দেশনা নেই।
এ দিকে লীজ বাতিল ও রাস্তা সংলগ্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ লীজপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গৌরীপুর পৌরসভার তৎকালিন মেয়র সৈয়দ রফিকুল ইসলাম ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসককে অভিযোগপত্র দেন। অভিযোগপত্রে, জমিদারের বিরল ডিজাইনের আকর্ষণীয় দৃষ্টিনন্দন থিয়েটারের মূল্যবান ও পুষ্প্রাপ্য কাঠ, লোহা, দরজা-জানালা বিক্রি, সিনেমা হলের ভিতরে ও বাহিরে অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র না থাকায় সৌন্দর্য্যহানির বিষয় তুলে ধরেন। এছাড়াও দালানকোঠা ভেঙ্গে ও অবকাঠামো পরিবর্তন করে ঝলমল সিনেমা হলের আর্কিটেকচার ভিউ এর পরিবর্তন, অবৈধ দোকানপাট নির্মাণ, পৌরসভা থেকে কোন ড্রইং, ডিজাইন, প্ল্যান ও অনুমোদন ছাড়া নির্মিত অবৈধ স্থাপনা পথচারীদের অসুবিধা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন। যেহেতু সিনেমা হল চালানোর জন্য বাণিজ্যিক হিসাবে লিজ প্রদান করা হয়েছিলো, সিনেমা বন্ধ থাকা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে লিজের শর্তভঙ্গের দায়ে লিজ বাতিল করে সরকারি সম্পদ প্রাচীন প্রত্নতত্ত্ব হিসাবে সংরক্ষণের সুপারিশ করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, পৌর মেয়রের দেয়া অভিযোগের পর স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষিত সম্পদে ধ্বংসযজ্ঞের উৎসব হয়েছে মহাধুমধামে। লিজের শর্ত ভেঙ্গে নির্মাণ কাজ করা হয়েছে খোদ প্রশাসনের সামনে।