ঢাকা | 31 August 2026

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উফুলকি গ্রামের ঘি যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি, .
নিউজ প্রকাশের তারিখ :Aug 31, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: ছবির ক্যাপশন:
ad728
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের উফুলকি গ্রামের ঘোষপাড়া। নিভৃত এই পল্লী গ্রামে তৈরি ঘি, ছানা ও টক দই বিক্রি হচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। যুগ যুগ ধরে চলা এই ব্যবসা যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। বাজারে খাদ্য দ্রব্যে ভেজাল থাকায় প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেনা পল্লী গ্রামের এই ঘোষ সম্প্রদায়।

সরেজমিনে উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের উফুলকি গ্রামে গিয়ে ঘোষ সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে কথা বলে এসব কথা জানা যায়।

গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতেই যন্ত্রের শোঁ শোঁ শব্দ, কেউ হাত দিয়ে ঘুরিয়ে যন্ত্র চালাচ্ছেন, কেউবা চালাচ্ছেন বিদ্যুতের সাহায্যে। যন্ত্রের ওপরের পাত্রে ঢালা হচ্ছে দুধ। ভাঙানোর পর এক পাশ দিয়ে বের হচ্ছে মাখন বা ক্রিম, যা থেকে তৈরি হয় ঘি। অন্য পাশ দিয়ে বের হওয়া পাতলা দুধ থেকে তৈরি হচ্ছে ছানা ও টক দই।

স্থানীয় লোকজন এই যন্ত্রকে ‘দুধ ভাঙানোর মেশিন’ নামে চেনেন। পূর্বপুরুষের আমল থেকে যুগ যুগ ধরে চলা এই এলাকার মানুষ দুধ থেকে ঘি, ছানা ও টক দই তৈরি করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন। বাজারে ভেজাল মিশ্রিত খাদ্য দ্রব্যের কারণে অনেকে ছেড়েছেন এই পৈতৃক পেশা। তবে এখনো হিন্দু-মুসলিম মিলিয়ে শতাধিক পরিবারের নারী-পুরুষ এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে এই কাজ। প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ মণ দুধ প্রক্রিয়াজাত করে ঘি, ছানা ও টক দই তৈরি করা হয়। এসব পণ্য মির্জাপুর বাজার, টাঙ্গাইল, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, চকবাজার, কচুক্ষেত ও নারায়ণগঞ্জে সরবরাহ করা হয়। কোনো কোনো দিন দুধের পরিমাণ ৫০ মণে নেমে আসে।

গ্রামের বাসিন্দা দীপক কুমার ঘোষ বলেন, ঘোষপাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৮০ নারী-পুরুষ এখনো এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। মুসলমান আছেন প্রায় ২০ জন। হাত দিয়ে মেশিন চালালে ঘণ্টায় প্রায় আট মণ দুধ ভাঙানো যায়। বিদ্যুৎচালিত মেশিনে এর পরিমাণ আরও বেশি।

এক মণ দুধ থেকে গড়ে সোয়া কেজি ঘি এবং মিষ্টি তৈরির জন্য সাত থেকে আট কেজি ছানা পাওয়া যায় বলে জানান। ছানার তুলনায় টক দই তৈরি করলে লাভ বেশি হওয়ায় তাঁরা সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন।

তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে এক মণ দুধ কিনতে খরচ হয় ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। শ্রমিকের মজুরি ও জ্বালানির খরচসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৩০০ টাকা। এক মণ দুধ থেকে পাওয়া ঘি ও ছানা বিক্রি করে আয় হয় ৩ হাজার ৬০০ টাকা বা তার কিছু বেশি। টক দই তৈরি করে বিক্রি করলে আয় হয় কিছু বেশি।

গ্রামের আরেক বাসিন্দা গীতা রানী ঘোষ বলেন, ‘মালের (পণ্যের) অর্ডার বুইঝা দুধ আসে। মাল বেশি গেলে ১২-১৪ মণ, আর কম হইলে ৮-১০ মণ দুধ আসে। দুধ ভাঙানোর সময় আমি সাহায্য করি। পুরুষরা ভাঙাইলে আমি দুধ মেশিনের ওপর দিয়া দিই।

মির্জাপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন বাজার থেকে ওই দুধ কেনেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা রতন ঘোষ। তিনি বলেন, শুক্রবার দেলদুয়ার বাজার থেকে প্রতি কেজি ৬০ টাকা দরে চার মণ দুধ কিনেছেন।

ছানার জন্য দুধ জ্বাল দেওয়ার সময় কথা হয় গ্রামের বাসিন্দা আবদুল খালেকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থিকা কাজ করি। আমারে মাইনষে ঘোষই মনে করে। মানুষ শীতে ঘি বেশি খায়। তখন একটু দাম থাকে।
গ্রামের বাসিন্দা অনিল চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘পৃথিবী সৃষ্টি হইছে পর থিকাই দুধ দইয়ের ব্যবসা আছে। আমাগো পূর্বপুরুষের এই ব্যবসা যুগ যুগ ধইরা চলতাছে।

জামুর্কী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য সুশীল চন্দ্র গোপ বলেন, ঘোষপাড়ার শতাধিক পরিবারের সদস্য এই পেশার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া এখান থেকে টক দই পাইকারি কিনে ফেরি করে বিক্রি করেন ৮০ জনের বেশি মানুষ। সরকার সহযোগিতা করলে তাঁরা পৈতৃক এই পেশা ধরে রাখতে পারবেন।

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জহিরুল আলম বলেন, নতুন যোগদান করেছি। ওই এলাকা পরিদর্শন করে ডিসি স্যারের সঙ্গে আলাপ করে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।




কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ