কামাল হোসেন
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক মো: রাজিব হোসেন ভূঞাপুরে যোগদানের পর থেকেই পৌরসভাকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ভোগান্তিবিহীন নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে তিনি বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মাস ঘুরতেই শহরের বিভিন্ন খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়। তবে তার বিভিন্ন পদক্ষেপে একটি মহল প্রথম থেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে বলেও আলোচনা রয়েছে। এমন ষড়যন্ত্রে উন্নয়ন কাজ থমকে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, সম্প্রতি উপজেলার পলশিয়া এলাকায় যমুনা নদীর চর কাটার অভিযোগে উপজেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে ১২টি খননযন্ত্র ও ৩টি মাটি পরিবহনকারী গাড়ি জব্দ করা হয়। এ সময় একই এলাকার মতিন নামের এক ব্যক্তিকে অবৈধভাবে চর কাটার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং প্রশাসনিক কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও তীব্র হয়।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) সন্ধ্যায় একটি ফেসবুক আইডি থেকে “পৌর প্রশাসকের অত্যাচারে চায়ের দোকান, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা অতিষ্ঠ” শিরোনামে মানববন্ধনের আহ্বান জানিয়ে একটি পোস্ট করা হয়। পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
কমেন্টবক্সে অনেকে বর্তমান পৌর প্রশাসকের বিভিন্ন কার্যক্রমের পক্ষে মতামত দেন। মশিউর সোহাগ নামের একজন মন্তব্যে লেখেন, “আমরা পূর্বের মেয়রকে দেখেছি এবং বর্তমান পৌর প্রশাসকের কাজও দেখছি। পার্থক্য আকাশ-পাতাল। সাধারণ মানুষ প্রশাসকই চায়।” এছাড়া আলামিন সরকার, মারুফ খান, সবুজ আল ফারাবি, মিন্টু, মনির, রিপনসহ আরও অনেকে প্রশাসকের পক্ষে মন্তব্য করেন।
মন্তব্যকারীদের অনেকে বলেন, পৌর প্রশাসকের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে শহরে যানজট ও ফুটপাত দখলের সমস্যা অনেকটাই কমেছে। এছাড়া অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও পরিবর্তন এসেছে বলে তারা দাবি করেন।
কয়েকজন মন্তব্যকারী দাবি করেন, অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত একটি পক্ষ পৌর প্রশাসকের বিভিন্ন পদক্ষেপে অসন্তুষ্ট। তারা মনে করেন, এসব কার্যক্রমের কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশাসককে ঘিরে সমালোচনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এর আগে গত বছরের ১৭ আগস্ট মো: রাজিব হোসেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে ভূঞাপুরে যোগদান করেন। একই সঙ্গে তিনি ভূঞাপুর পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি শহরের বিভিন্ন অলিগলি হেঁটে পরিদর্শন করেন। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য উপজেলা প্রাঙ্গণের দক্ষিণ পাশে একটি পুনর্বাসন শেড নির্মাণ করে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আগে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন নামে চাঁদা উত্তোলনের অভিযোগ ছিল। পুনর্বাসনের পর সেই অভিযোগ অনেকটাই কমে আসে বলে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ দাবি করেন।
পৌরশহর পরিচ্ছন্ন ও যানজটমুক্ত রাখতে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন অপসারণ করা হয়। এছাড়া পুকুরের ঘাটলা, রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণসহ পৌরবাসীর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সাপ্লাই পানির কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সম্প্রতি এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
পৌরসভার আবাসিক এলাকার বিভিন্ন ড্রেনে সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য ফেলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ ছিল। এ পরিস্থিতিতে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত ফির বিনিময়ে সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চালু করা হয়। এ জন্য পৌরসভার নিজস্ব গাড়ি ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য একটি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টও চালু করা হয়েছে।
এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খবর সাধারণ মানুষের নজরে আনতে তথ্যবোর্ড ও সংবাদ কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া যত্রতত্র পার্কিং ও অগোছালো পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে আলাদা রুটে ভাগ করে ৩টি সিএনজি, অটো ও ভ্যানস্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে বাসস্ট্যান্ডও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
সচেতনতা বৃদ্ধি, যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে পৌরসভার অর্থায়নে অটো, ভ্যান ও রিকশাচালকদের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে ট্রাফিক সিগন্যাল ও ট্রাফিক আইন মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়াতে পৌর শহরের বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপন, অসহায়-দুস্থ মানুষদের আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ ভূঞাপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ সংস্কার এবং খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষকতাও করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয়দের মধ্যে তার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা দেখা যায়। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ‘ফাটাকেষ্ট’ বলেও উল্লেখ করেন।
এদিকে নিরবিচ্ছিন্ন ভূমি সেবাতেও তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে সাধারণ নামজারিতেও দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হতো। বর্তমানে সরকারি নির্ধারিত ফির মাধ্যমে ভোগান্তি ছাড়াই নামজারি সেবা পাওয়া যাচ্ছে বলে সেবাগ্রহীতাদের অনেকে জানান। এছাড়া রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।
ইতোমধ্যে তিনি পদোন্নতির আদেশ পেয়েছেন। ভূঞাপুর ছাড়ার আগে আরও কয়েকটি উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: রাজিব হোসেন জানান নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত কল্পে পৌরসভাকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি কাজের পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গৃহস্থালি বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন স্থানান্তর, পৌরসভার সকল কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, রাস্তা, ড্রেন, টয়লেট, যাত্রী ছাউনি ও শাখা রাস্তাগুলো সিসিটিভি মনিটরিংয়ের আওতায় আনা, পৌর এলাকার আলোকবাতির সংযোগ পরিধি বাড়ানো এবং পথচারীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ প্রকল্প।