২০১৫ সালের ১৪ জুলাই। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। ওইদিন দুপুরে টাঙ্গাইলের সখীপুরে রাজ্জাক মাহমুদ (৩০) নামের এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পৌর শহরের ফাহিম সুপার মার্কেটের রক স্টাইল ফ্যাশন হাউজের মালিক রুবেল নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটায়। রুবেল ওই মার্কেটের মালিক ও পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আশরাফ পাহাড়ির ছেলে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে হত্যাকারীর মার্কেট এবং বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করে এলাকাবাসী। বিক্ষোভকারীরা একপর্যায়ে সখীপুর তালতলা চত্ত্বরে টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করে মিছিল ও সমাবেশ করে। ওইদিন পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিল।
আলোচিত এ ঘটনার ১১ বছর পর গতকাল শুক্রবার (২৪ জুলাই) জুমার নামাজের পর নিহত রাজ্জাক মাহমুদের স্বজনেরা দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত রায় ঘোষণার দাবিতে মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধনে নিহত রাজ্জাকের বাবা শামসুল আলম, মা রাজিয়া বেগম, উপজেলা বিএনপির সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, সখীপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এম আর বি হাসেম, যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আরিফ প্রমুখ বক্তব্য দেন।
নিহত রাজ্জাকের বাবা শামসুল আলম (৭৫) বলেন, আমরা প্রতিশোধ চাই না, আমরা ন্যায়বিচার চাই। ১১ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরছি। এখনও রায় ঘোষণা হয়নি। প্রতিদিন শুধু একটি প্রশ্নই আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়, ছেলে হত্যার বিচার কি আমরা জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব?
রাজ্জাকের মা রাজিয়া বেগম বলেন, ঘটনার পর বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের চাপে বিভিন্ন সময়ে আসামি নাছির ও শাহআলমকে গ্রেপ্তার করা হলেও তারা বর্তমানে জামিনে বেরিয়ে বাইরে ঘুরছে। শুনেছি মূল আসামি রুবেল পাশ্ববর্তী উপজেলায় আত্মগোপনে আছে। তাদের ধরতে পুলিশ কোনো আগ্রহই দেখায় না।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই দুপুর আড়াইটার দিকে পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা গাড়ি ব্যবসায়ী রাজ্জাক মাহমুদের এক আত্মীয় ফাহিম সুপার মার্কেটের নিচতলার ‘রক স্টাইল ফ্যাশন' হাউজে কেনাকাটা করতে গিয়ে ওই দোকানের মালিক রুবেলের সঙ্গে কথা কাটাকাটির ঘটনা ঘটে। কিছুক্ষণ পর রাজ্জাক তাঁর বন্ধুদের নিয়ে ওই দোকানে গেলে রুবেল তাঁদের সঙ্গেও ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে রুবেল চাপাতি নিয়ে রাজ্জাককে ধাওয়া করলে সে দৌঁড়িয়ে মার্কেটের দোতলায় ওঠে। রুবেল সেখানেই রাজ্জাককে এলোপাতারি কুপিয়ে আহত করেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় রাজ্জাককে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর খবর সখীপুরে ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ মোটর মালিক, শ্রমিক ও এলাকাবাসি লাঠিসোঁটা নিয়ে ফাহিম সুপার মার্কেটে হামলা চালায়। এক পর্যায়ে তারা রুবেলের বাড়িতেও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। বিক্ষুব্ধরা সন্ধ্যা পর্যন্ত টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করতে থাকে। পুলিশ তাৎক্ষণিক নাছির উদ্দিন নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে।
পরে ২০১৫ সালের ১৫ জুলাই রাতে নিহত রাজ্জাক মাহমুদের মা রাজিয়া আক্তার বাদী হয়ে সখীপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফাহিম সুপার মার্কেটের মালিক আশরাফ পাহাড়ি (৬৬), তাঁর দুই ছেলে রুবেল (৩০) ও শাহ আলম (৩৩) এবং তাঁর সমন্ধির ছেলে নাসির উদ্দিনকে (২৬) আসামি করা হয়।
জানতে চাইলে গতকাল শুক্রবার বিকেলে মামলার আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মোবাইল ফোনে বলেন, মামলাটি এখনও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ৩০ জুলাই শুনানি হবে। আশা করছি দ্রুতই এ মামলার রায় ঘোষণা হবে। আমার বিশ্বাস আসামিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাজার রায় ঘোষণা করা হবে।