অতিরিক্ত ফি (টাকা) না দেয়া এবং না নেয়ার জন্য ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে মাইকিং শুরু করেন রোববার (৬ সেপ্টেম্বর)। নির্ধারিত মুসাবিদা ফিসের অতিরিক্ত অর্থ দেয়া-নেয়া বন্ধের এ ঘোষণার প্রেক্ষিতে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর/২৭) কর্মবিরতীর ডাক দেন দলিল লেখক সমিতি। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর/২৬) সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাবরেজিস্ট্রি অফিসে কর্মবিরতীর কারণে জমি ক্রেতা-বিক্রেতারা দলিল সম্পাদন না করেই বাড়ি ফিরছেন। এতে অনেকের নিজের চিকিৎসা, ছেলে-মেয়ের বিয়ে, বাবা-মায়ের চিকিৎসা, বিদেশগমনসহ নানা জরুরি কাজ আটকে গেছে। নানা ঘটনায় একের পর এক দলিল লেখককে লেখিত ও মৌখিকভাবে বরখাস্তের ঘটনায় দলিল লেখকদের মাঝেও অসন্তেুাষ্টি বিরাজ করছে।
পৌর শহরের বাড়িওয়ালাপাড়ার আরশেদুল হক, দৌলতপুরের ফজলুর রহমান, বোকাইনগর ইউনিয়নের ত্রিশঘরের আব্দুর রাশিদ, রামগোপালপুরের আব্দুল মজিদ জানান, আমরা প্রতিদিন এসে ঘুরছি। দলিল না হওয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছি।
এ বিষয়ে গৌরীপুর সাবরেজিস্টার মো. রফিকুল ইসলাম জানান, সরকারের নির্ধারিত ফিস ও মজুরীর বাহিরে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করা যাবে না বলা হয়েছে। এরপরে তো দলিল লেখক সমিতির কেউ আসে নাই। কিছু বলেও নাই। আমি নিয়মিত আসছি, দলিল লেখকগন দলিল মুসাবিদা করে দিচ্ছেন না।
এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ জেলা রেজিস্টার পথিক কুমার সাহা জানান, বিষয়টি আমি আজকের (বুধবার) অবগত হয়েছি। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।
অভিযোগ রয়েছে গৌরীপুর সাবরেজিস্টার অফিসে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সেরেস্থার নামে ঘুস নেয়া হতো। মো. রফিকুল ইসলাম সাবরেজিস্টার যোগদানের পরে বন্ধ হয় সাইনবোর্ডের ঘুস। সাইনবোর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, প্রত্যেকটি দলিলে ৬হাজার থেকে ১০হাজার টাকার জন্য ১হাজার ৫শ টাকা, ১০হাজার এক টাকা থেকে ১৫হাজার পর্যন্ত ১হাজার ৮শ টাকা, ১৫হাজার ১টাকা থেকে ৩০হাজার পর্যন্ত ২হাজার ১শ টাকা, ৩০হাজার এক টাকা থেকে ৫০হাজার পর্যন্ত ২হাজার ২শ টাকা, ৫০হাজার এক টাকা থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত ২ হাজার ৩ শ টাকা, ৮০ হাজার এক টাকা থেকে ১লাখ পর্যন্ত ২হাজার ৪শ টাকা, এক লাখ এক টাকা থেকে ২লাখ পর্যন্ত ২ হাজার ৬ শ টাকা, দুই লাখ এক টাকা থেকে তিন লক্ষ টাকার দলিলে ৩ হাজার ১ শ টাকা সেরেস্থা, তৎ উর্ধে প্রতি লাখে ৪ শ টাকা করে সেরেস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়াও ভ্রম সংশোধন দলিলে সাবরেজিস্টারকে ৩হাজার টাকা, নাদাবী, বায়নাপত্র দলিলের জন্য ৩ হাজার টাকা, মর্গেজ বিশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দলিলে ৩হাজার টাকা এবং তৎ উর্ধে ৪হাজার টাকা, কমিশন পৌর ফিস বাদে ৪হাজার টাকা, ইউনিয়ন ফিস বাদে প্রতি দলিলে সাবরেজিস্টার নিতেন ৬হাজার টাকা। এ সাইনবোর্ডের হিসাব অনুযায়ী ২০২২ সনে ৬ হাজার ৪১ টি দলিল থেকে প্রায় ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ২০২৩ সনে ৫ হাজার ৪৭১ টি দলিল থেকে প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, ২০২৪ সনে ৪ হাজার ৫১৬ টি দলিল থেকে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা সেরেস্থা (ঘুস) আদায় করা হয়েছে। এছাড়াও দলিল লেখকরাও প্রত্যেকটি দলিলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সনের ২০ অক্টোবর সাবরেজিস্টার রফিকুল ইসলাম এ অফিসে যোগদানের পরেই সাইনবোর্ডের নির্ধারিত সেই সেরেস্থা নেয়া বন্ধ হয়ে যায়। একই সাথে দলিল লেখকদের উপরেও নানা বিধিনিষেধ অর্পিত হয়। বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন সময়ে সেনাক্যাম্প ও প্রশাসনিক দপ্তরে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সাবরেজিস্টারের এ নিধেষাজ্ঞা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বাহিরে চলছিল অফিসের কতিপয় কর্মচারী ও দলিল লেখকদের যোগসাজশে অতিরিক্ত ফিস আদায়। এ বিষয়টিও জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক দপ্তরে গড়ায়।এর প্রেক্ষিতে ২৪ আগস্ট সাবরেজিস্টার মো. রফিকুল ইসলাম অতিরিক্ত ফিস না নেয়ার জন্য লিখিত নোটিশ জারী করেন। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর/২৬) থেকে প্রত্যেকটি দলিলের খরচ বিবরণী দিয়ে মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়। এ নিয়ে দলিল লেখক ও সাবরেজিস্টারের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
এ নিয়ে কর্মবিরতীর ডাক দেন দলিল লেখক সমিতি। তারা জানান, বর্তমান সাবরেজিস্টার প্রতি পৃষ্ঠা ১৫ টাকা অর্থাৎ দলিল ১০পৃষ্ঠার হলে মজুরি আসে মাত্র ১৫০টাকা। যা একজন দৈনিক শ্রমিকের মজুরিই হয় না। ব্রিটিশ আমলে নির্ধারিত ফিসে দলিলের মুসাবিদা করা সম্ভব না। বর্তমান বাজারদরের সাথে মিল রেখে প্রত্যেকটি দলিল কমপক্ষে ৫হাজার টাকা মুসাবিদা ফিস নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছি।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম হাচিবেশ শাহীদ মুনশী জানান, সাবরেজিস্টারকে আমি কোনোদিন নিজের হাতে ঘুস দেই না। তবে অফিসের নির্ধারিত ফিস ছাড়া কোনোদিন একজন সাবরেজিস্টার দলিল করতে পারে নাই। সেখানে সর্বনিম্ন ৩লাখ টাকার দলিলে ৩হাজার ৪শ টাকা, তৎউর্ধে প্রতি লাখে ৪শ টাকা করে সেরেস্থা দিতে হয়েছে। ৬ তারিখ সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে অতিরিক্ত ফিস বন্ধের ঘোষণা দেয়া হলেও সেই দিনেও অফিসের ঘুস দিতে হয়েছে। পরে তা ফেরত দিয়েছে অফিস মোহরা (অফিস সহকারী) আমিনুল ইসলাম। এ আমিনুল ইসলাম হলেন সাবরেজিস্টারের বিশ^স্থ্য ও আস্থাভাজন। এছাড়াও পিতা-মাতা ও দাদা-দাদীর নামে বিআরএস খতিয়ান মূলে জমির দলিল হলে ৩হাজার টাকা, দাতার একাধিক নামের হরফ (অক্ষর) ব্যবহার করলে ৩হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয়। অপরদিকে দলিল লেখক সমিতির নামেও প্রতি দলিলে ২হাজার ২শ টাকা করে গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।
এ দিকে সাবরেজিস্টারের ঘুস ও দুর্নীতির ঘটনা নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইনের নিকট অভিযোগ দেন। সেখানে তারা আরও উল্লেখ করেন নামজারি, পর্চা, ওয়ারিশান সনদপত্র, নামের করনিক ভুলের এফিডেভিট থাকলেও সাবরেজিস্টার হয়রানি করেন। লিখিতভাবে ৩জন ছাড়াও মৌখিকভাবে সাসপেন্ড (কর্মহীন) করেছেন ২৯জন দলিল লেখককে। অফিস সহকারী আমিনুল ইসলাম জানান, নকলনবিশ (এক্সট্রা মোহরার) ফিস (১০পৃষ্টার হলে ৩৬০টা) ব্যতিত অন্য কোন টাকা আমি গ্রহণ করি নাই। এসব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
তিনি বলেন, জন্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী দলিলে দিন-তারিখ সঠিকতা না হওয়ায়, ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য তাদেরকে একাধিকার সতর্ক করা হয়েছে। একসাথে এতো দলিল লেখককে বরখাস্ত করা হয়নি। তবে দলিল লেখক আব্দুল জলিল মুনশী, নুরুল ইসলাম ও সন্তোষ চন্দ্র বিশ^শর্মাকে লিখিতভাবে বরখাস্ত করা হয়। বিষয়টি উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষও জানেন।
দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম হাচিবেশ শাহীদ মুনশী জানান, আমরা আমাদের সমিতির জন্য নিজেরা টাকা দেই। আমাদের কল্যাণেই তা ব্যয় হয়। বাড়তি টাকা নেয়া হয়না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইন জানান, আমি একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি দেখছি। তবে দুর্নীতি-অনিয়মকে কোনোভাবেই ছাড় বা প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।