ঢাকা | 18 October 2026

অহন আমরা কী করমু...

স্টাফ রিপোর্টার, .
নিউজ প্রকাশের তারিখ :Oct 18, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: ছবির ক্যাপশন:
ad728
জমি লিজ নিয়া ২৫ বিঘা জমিতে কলা আবাদ করছি। চাষ, রোপন, সার দেওয়ার পর গাছে গাছে কলার কাদি ধরেছে। প্রায় ৩৫ লাখের উপর খরচ অইছে। এর মধ্যে ২৫ লাখই ঋণ। ব্যাংক, এনজিও এবং ব্যক্তির কাছ থিকা দাদন নিছি। হায়রে কপাল দশ মিনিটের ঝড়ে সব শেষ। লন্ডভন্ড অইছে পুরা কলাবাগান। যেনু লাখ লাখ টাকার কলা বেচুম হেনু এক টাকার কলা বেচর জো নাই। অহন আমি কী করমু?  বাগান করমু কিদিয়া? ঋণ শোধামু কিবায়? অহন আমি নিঃস্ব? কিস্তির টাকা পামু কই। ব্যাক্তির কাছ থিকা মাসিক হারে নেওয়া দাদনের টাকাইবা শোধামু কিবায়? কিবায়বা সংসার চালামু। কথাগুলো বলছিলেন পিরোজপুর গ্রামের উদ্যোক্তা কৃষক সুমন মাহমুদ। তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার অরণখোলা ইউনিয়নের ভুটিয়া গ্রামে কলা চাষ করেছিলেন। বুধবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে কয়েকমিনিটের ঝড়ে এই ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। তাঁরমত প্রায় তিন শতাধিক কৃষক কলা, পেঁপে আবাদ করে ঝড়ের কারণে সর্বশান্ত হয়েছেন। আংশিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন আরও অনেকে।

মধুপুর উপজেলার উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা জানান, ফল-ফসলের ভান্ডার খ্যাত মধুপুরের শোলাকুড়ী, ফুলবাগচালা, মমিনবাগ, জয়নাগাছা, ভুটিয়াসহ কয়েকটি গ্রামের উপর দিয়ে আচমকা ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে ১৭২ হেক্টর কলা ও ৩ হেক্টর পেঁপেঁ বাগান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩৪ হেক্টর কলা এবং ৬ হেক্ট পেঁপেঁ। এছাড়াও বেশ কিছু আখ খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৩৯৮জন। কৃষি বিভাগের হিসাবে আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬০ কোটি টাকার উপরে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি। কৃষকরা কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন, প্রান্তিক জনপদে কোন কৃষি উপকরণই তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে কিনতে পারেননা। তারা সবকিছু উচ্চমূল্যে কেনায় ব্যয়ের হিসাব সরকারি হিসাবের সাথে মিলেনা।

হরিণধরা গ্রামের কৃষক মোতালেব হোসেন। তিনি ১২বিঘা জমিতে কলা আবাদ করেছেন। তারও বাগানের সব কলাগাছে ভেঙ্গে পড়ে গেছে। অনেক গাছে ধরে থাকা অপরিপক্ক কলার কাদি মাটিতে লুটিয়ে রয়েছে। ১০ মিনিটের ঝড়ে কলাবাগানের সাথে তার স্বপ্নও তছনছ হয়ে গেছে। মোতালেব হোসেন জানান, ১০ লাখ টাকার উপরে ঋণ করে কলা বাগান করেছি। আমার জমানো সঞ্চয়, গয়না বেচা টাকা, ঋণের টাকা সব শেষ অইয়া গেছে। অহন চোখে মুখে অন্ধকার দেখতাছি।

কৃষক আনিছুর রহমান জানান, পাহাড়ের ছোট বড় বেবাক কৃষকের ঋণ কইরা বাগান করন নাগে। আমিও ২০ লাখের উপর ঋণ করছি। ধানের জমিও লাগাইয়া টাকা আইনা বাগানে খাটাইছি। এক মুহুর্তে বেবাক শেষ। 
রাবেয়া বেগম বহু কষ্টে এক বিঘা জমিতে কলা আবাদ করেছিলেন। তিনিও স্বপ্ন বুনেছিলেন ঋণ করে। তাঁর বাগানও ধ্বংস হয়ে গেছে। 

কৃষক মজনু মিয়া জানান, আমি ১২ হেক্টর জমিতে আনারস, কলা, পেঁপে আবাদ করছি। আমার চার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু খেতে কলা বাগান একবারে শেষ। পেঁপেঁ বাগানও ৬০% ক্ষতিগ্রস্ত অইছে। বাজার দর কম থাকলেও শুধু পেঁপেঁই বিক্রি করতাম অন্তত ৮০-৮৫লাখ টাকা। অহন অর্ধেক টাকাও ঘরে উঠবোনা। কোটি টাকার উপরে আমার খরচ অইছে। ঋণও আছে প্রায় ২৫-৩০ লাখ টাকা। আল্লায় বাঁচাইছে। আমার আট হেক্টরে কোন ক্ষতি হয়নাই। নইলে আমারও পথে বসন নাগতো।

হরিণধরা গ্রামের কৃষক নূর মুহাম্মদের ২ বিঘা পেঁপে, পাঁচ বিঘা লাউ পাঁচ একেবারে নষ্ট হয়েছে। গাবগাইছা গ্রামের কৃষক আবেদ আলীর ১৭ শ কলাগাছ ঝড়ে ভেঙ্গে গেছে। ক্ষতির পরিমান ধারনা করা হচ্ছে প্রায় ৮ লাখ টাকার মতো। একই গ্রামের জিয়াউল হকের (৪৮) ৫০ বিঘা জমির কলাসহ গাছ ভেঙে পড়েছে।

ওই অঞ্চলে বড় থেকে ছোট সকল কৃষকই ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা রিপন আল মেহেদী। তিনি জানান, কৃষকরা বছর শেষে ফল বিক্রি করে নগদ টাকা পায়। সেই টাকা দিয়া ঋণ শোধায়। সংসারের কাজ করে। বাগান বাড়ায়। সেই স্বপ্ন নিয়েই কৃষকরা ধারদেনা করে বাগান সাজিয়েছিলো। বিধি বাম হওয়া এবার অধিকাংশ কলা পেঁপেঁ চাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তারা সবচেয়ে বেশিমাত্রায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন ঋণের কথা ভেবে। 

কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এবিএম খায়রুল আলম জানান, আমরা ক্ষয়ক্ষতি নিরুপন করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আমাদের পক্ষ থেকে দাড়ানোর বা করার তেমন কিছু নেই। সরকার যদি কোন বরাদ্দ দেন আমরা তালিকা অনুসারে সেই অনুদান বা প্রণোদনা পৌঁছে দিতে পারবো।

মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, অসময়ের ঝড়ে পাহাড়ী অঞ্চলের তিনটি ইউনিয়নের ৭টি ব্লকের প্রায় চারশ কলা ও পেঁপেঁ চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমরা ঝড়ের খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে গিয়েছি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপন করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। আমাদের হিসেবে ৬০ কোটি টাকার উর্ধ্বে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কৃষক আনিছুর রহমান ক্ষোভের সাথে বলেন, আমরা বহুকষ্টে পাহাড়ী অঞ্চলে ফসল ফলাই। কিন্তু আমাদের জন্য কোন ধরণের সরকারি সুবিধাও নেই। এমনকি পাহাড়ী অঞ্চলের জন্য কোন বরাদ্দ নেই। আমরা অতিরিক্ত ব্যয় করে চাষাবাদ করি। ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিঃস্ব হই। আবার ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করি। সরকার যদি ক্ষতিগ্রস্তদের অনুদান দেন তবে কৃষকরা ভরসা পাবে। সংসার গোছাতে পারবে। অন্যথায় তারা আরও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বে। আর এনজিও ও ব্যাংক ঋনের কিস্তি চলতি বছরে না নেওয়ার দাবি জানান তিনি। 




কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ