টাঙ্গাইলের বাসাইলে মায়মুনা আক্তার তন্নী নামের এক গৃহবধূকে (২০) হত্যার পর লাশ ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবার আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। গত ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে বাসাইল সদর ইউনিয়নের নাইকানীবাড়ী উত্তর পূর্বপাড়া এলাকায় স্বামী মেরাজ সিকদারের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত তন্নী একই এলাকার মানিক মিয়া ওরফে রনির মেয়ে।
অভিযুক্তরা হলেন- বাসাইল সদর ইউনিয়নের নাইকানীবাড়ী উত্তর পূর্বপাড়া এলাকার কালাম সিকদারের ছেলে মেরাজ সিকদার (৩০), মেরাজের বাবা কালাম সিকদার (৫২) ও মা জাহান আরা বেগম (৪৮)।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, ২০২২ সালে বাসাইল সদর ইউনিয়নের নাইকানীবাড়ী উত্তর পূর্বপাড়া এলাকার কালাম সিকদারের ছেলে মেরাজ সিকদারের সাথে একই এলাকার মানিক মিয়া ওরফে রনির মেয়ে মায়মুনা আক্তার তন্নীর পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। ওই সময় ৫ লাখ টাকা কাবিনে বিয়েটি সম্পন্ন হয়। বিয়ের সময় দেড় ভরি স্বর্ণ ও কিছু ফার্ণিচার দেওয়া হয়। বিয়ের ৩ মাস পর পারিবারিক কাজের কথা বলে মেরাজ তার শশুরের কাছ থেকে দুই লাখ নেন। এরপর প্রবাসে যাওয়ার কিছুদিন পর মেরাজ তার স্ত্রী তন্নীর কাছে আরও টাকা দাবি করেন। তন্নী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মুঠোফোনে তাকে গালিগালাজ শুরু করে মেরাজ। বিভিন্ন সময় যৌতুকও দাবি করা হয়। দেওয়া হয় তালাকের হুমকিও। বিয়ের সময় মেরাজকে সৌদিতে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তন্নীর পরিবার তাকে সৌদিতে নিতে পারেনি। এজন্য আরও তিক্ততা বেড়ে যায়। এরমধ্যে তাদের সংসারে এক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। বর্তমানে শিশু মিজানুরের বয়স এক বছর ৭ মাস। সর্বশেষ গত মে মাসে মেরাজ ছুটি নিয়ে দেশে আসে। দেশে আসার পর মেরাজ তন্নীতে রাতে মারধর করে ঘর থেকে বের করে দেয়। গত জুলাই মাসে মেরাজ আবার মালদ্বীপে চলে যায়। এই সময়ে তন্নীকে হত্যার জন্য মেরাজ তার বাবা-মায়ের সাথে পরিকল্পনা করে। এরপর থেকে তন্নীর শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করে আসছিল। বিভিন্ন সময় শ্বশুর-শাশুড়ি তন্নীর মৃত্যু কামনা করতো। গত ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তন্নীকে তার শ্বশুর-শাশুড়ি বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ ও শারীরিক নির্যাতন করে। বিষয়টি তন্নী তার বাবা ও মাকে অবগত করে। পরদিন ২৬ সেপ্টেম্বর সকালেও মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে মেরাজের প্ররোচনায় তার বাবা কালাম সিকদার ও মা জাহান আরা বেগমসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তন্নীতে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ গোসলখানায় ঝুলিয়ে রাখে। পরে তারা বিষয়টি আত্মহত্যা বলে এলাকায় প্রচারণা চালায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।
এদিকে, বাসাইল থানা পুলিশ অপমৃত্যু মামলা নিলেও আদালতে নিহত মায়মুনা আক্তার তন্নীর মা সালেহা বেগম বাদি হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নিহত মায়মুনা আক্তার তন্নীর মা সালেহা বেগম বলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই পারিবারিক কলহ চলছিল। মাঝে মধ্যেই আমার মেয়েকে মারধর করা হয়েছে। বিষয়টি এলাকার প্রায় লোকজনেই জানেন। একবার সালিশও হয়েছে। বিয়ের সময় মেয়ের জামাই মেরাজকে সৌদিতে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা তাকে নিতে পারিনি। মেরাজ তার পারিবারিক কাজের কথা বলে দুই লাখ টাকা নিয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময় যৌতুক দাবি করে আসছিল। আরও টাকা না দেওয়ায় মেরাজ ও তার পরিবারের সাথে বিরোধের সৃষ্টি হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর মেরাজের বাবা ও মা আমার মেয়েকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। মারধরের বিষয়টি আমাদেরকে জানিয়েছিল। কিন্তু তন্নীর বাবা শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকার কারণে ওই বাড়িতে যেতে পারিনি। পরদিন দুপুরের দিকে তন্নীর শ্বশুর-শাশুড়ি কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ গোসলখানার রুয়ার সাথে ঝুলিয়ে রাখে। এরপর তারা বিষয়টি আত্মহত্যা বলে এলাকায় প্রচারণা চালায়। আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেনি, তারা আমার মেয়েকে হত্যা করেছে। আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই।’
নিহতের বাবা মানিক মিয়া বলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আমার মেয়ে হত্যার বিচার দাবি করছি। তারা হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় বাসাইল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করতে চাইলে, পুলিশ আমার কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে অপমৃত্যু মামলা করেছে।’
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত কালাম সিকদার (নিহত তন্নীর শশুর) বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। পাশের বাড়ির লোকজনের কাছে জানতে পারি মেরাজের বউ আত্মহত্যা করেছে। তারা বলতে পারে- আমরা হত্যা করেছি, আসলে তা না, সে আত্মহত্যা করেছে। তাকে কখনও মারধর করা হয়নি।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাসাইল থানার এসআই কামাল হোসেন বলেন, ‘ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে কিনা এবং ঘটনার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে আদালত।’