ঢাকা | 08 September 2026

আগাম টক বরই চাষে কোটি টাকার স্বপ্নের দুয়ারে কৃষক মোসলেম

বিশেষ প্রতিবেদক, .
নিউজ প্রকাশের তারিখ :Sep 8, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: ছবির ক্যাপশন:
ad728
যতদূর চোখ যায়, কেবলই সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে থোকায় থোকায় ঝুলছে গাঢ় সবুজ ও হালকা হলদে রঙের টক বরই। মিষ্টি রোদে বাতাসে দুলছে ফলের ভারে নুয়ে পড়া ডালপালা। এটি কোনো সাধারণ বাগান নয়; প্রায় ৫০ একর বিস্তৃত পাহাড়ি ও সমতল ভূমির ওপর গড়ে তোলা এক সুবিশাল বরই সাম্রাজ্য।

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ইন্দারজানি-ঘাটাইল সীমান্ত এলাকায় লাল মাটির বুকে এই অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়েছেন কৃষক মোসলেম উদ্দিন। প্রায় এক যুগ ধরে দেশীয় আগাম জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে তিনি যেমন নিজের ভাগ্য বদলেছেন, তেমনি স্থানীয় কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে তৈরি করেছেন এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। চলতি মৌসুমে নিজের ৯ হাজার গাছ থেকে প্রায় কোটি টাকার বরই বিক্রির আশা করছেন তিনি। উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্তনখোলা গ্রামের সন্তান মোসলেম উদ্দিনের কৃষির সাথে পথচলা প্রায় ৩০ বছরের। জীবনের সিংহভাগ সময়ই তিনি পার করেছেন মাটির বরই বাগানে কৃষক মোসলেম উদ্দিনের ব্যস্ততা।

পরম মমতায়। ধান বা প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু করার চিন্তা থেকেই তিনি প্রথমে গড়ে তুলেছিলেন লেবু বাগান। সেখানে অভূতপূর্ব সফলতা ও আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন করার পর তার চোখ পড়ে আগাম ফলের বাজারের দিকে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, কঠোর পরিশ্রম, অসীম ধৈর্য ও সঠিক পরিকল্পনাকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তোলেন দেশীয় আগাম জাতের টক বরইয়ের এই বিশাল বাগান। দীর্ঘ ১২ বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় তিলে তিলে আজ ৫০ একর জমিতে প্রায় ৯ হাজার টক বরই গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসের শুরু থেকেই বাগান থেকে আগাম টক বরই তোলা ও বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরেজমিন বাগান পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় এক কর্মমুখর আমেজ। বাগানের ভেতরে মোসলেম উদ্দিন ও শ্রমিকদের ব্যস্ততার শেষ নেই। বিশেষ কৌশলে গাছ থেকে বরই পাড়ছেন একদল শ্রমিক। সংগৃহীত বরইগুলো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ময়লা দূর করা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে গুণগত মান অনুযায়ী আলাদা ঝুড়িতে রাখা হচ্ছে। ওজন ও ডিজিটাল নিক্তিতে মেপে বরইগুলো পাটের বস্তায় ভরা হচ্ছে বিক্রির জন্য। প্রতিদিন এই বাগানে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। আর মৌসুমের ভরা সময়ে শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জনে। এর ফলে স্থানীয় বেকার নারী-পুরুষদের জন্য একটি টেকসই মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

কৃষক মোসলেম উদ্দিনের বাগানের আগাম বরইয়ের প্রধান আকর্ষণ হলো-সাধারণ বরই বাজারে আসার বহু আগেই এটি পরিপক্ক হয়।

ফলে বাজারে এর চাহিদা এবং দাম দুটোই থাকে আকাশচুম্বী। কৃষক মোসলেম উদ্দিনের বাগানের আগাম বরইয়ের প্রধান আকর্ষণ হলো-সাধারণ বরই বাজারে আসার বহু আগেই এটি পরিপক্ক হয়। ফলে বাজারে এর চাহিদা এবং দাম দুটোই থাকে আকাশচুম্বী। প্রতি বস্তায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত বরই থাকে। বর্তমানে বাজারে পাইকারি প্রতি কেজি আগাম টক বরই বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে। এতে করে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার বরই বিক্রি করছেন তিনি। এতে করে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার বরই বিক্রি করছেন তিনি। পুরো মৌসুমজুড়ে সব মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার বরই বিক্রি করার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী মোসলেম উদ্দিন।

কৃষিতে সাফল্য এনে মোসলেম উদ্দিন আজ শুধু স্বাবলম্বী নন, তিনি পুরো সখীপুর উপজেলার তরুণ ও সম্ভাবনাময় কৃষি উদ্যোক্তাদের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাকে অনুসরণ করে এলাকার অনেক বেকার যুবক এখন কৃষিমুখী হচ্ছেন।

গজারিয়া গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা রাজিব সিকদার জানান, 'এইচএসসি পাস করে অনার্সে ভর্তি হওয়ার পর আমি ঘোর আর্থিক সংকটে পড়ি। তখন মোসলেম কাকার অভূতপূর্ব সফলতা দেখে উদ্বুদ্ধ হই। পরে তার পরামর্শে লেবু বাগান শুরু করি এবং আজ আমিও স্বাবলম্বী।'

একইভাবে ছোট মৌশাগ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, "আমি জমি লিজ নিয়ে সখীপুর পৌরসভার কাহারতা এলাকায় কলা বাগান শুরু করি। আজ আমি সফল। আমাদের সখীপুরে মোসলেম উদ্দিন ভাইয়ের মতো মানুষের সফলতাই আমাদের মতো তরুণদের মাটির কাছে টেনে এনেছে।"

কৃষক মোসলেম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের বেকার তরুণ-তরুণীরা বড়ই, লেবু, মাল্টা, কলা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ফলজ বাগানের মাধ্যমে করে সফলতা অর্জন করতে পারেন। বাংলাদেশের মাটি বরইসহ অন্যান্য ফল চাষের জন্য খুবই উর্বর। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে অবশ্যই কৃষিতে সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, আমার ৫০ একর বরই বাগান এখন শুধুই ফলের বাগান নয়, বরং এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা ও কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম ও একটা অনুপ্রেরণার ক্ষেত্র পরিধি।

সখীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম শওকত আলী মাস্টার মোসলেম উদ্দিনের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, 'মোসলেম উদ্দিন একজন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও বিচক্ষণ মানুষ। দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সাথে কৃষি কাজ করে তিনি নিজের ভাগ্য বদলেছেন এবং এলাকার তরুণদের পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাদের এলাকার গর্ব।'
সখীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন বলেন, 'সখীপুরের মাটি ও আবহাওয়া ফল চাষের জন্য অত্যন্ত মানানসই। দেশীয় আগাম জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে মোসলেম উদ্দিন যে সাফল্য দেখিয়েছেন, তা সখীপুরের কৃষি খাতে এক নতুন মাইলফলক। নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে এবং যেকোনো ধরনের কারিগরি পরামর্শ দিতে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সবসময় কৃষকদের পাশে রয়েছেন।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ