টাঙ্গাইল সদর উপজেলার রসুলপুরে বাছিরন নেছা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জমে উঠেছে প্রায় দেড় শ বছরের ঐতিহ্যবাহী জামাই মেলা। তিন দিনব্যাপী জামাই মেলা শনিবার থেকে শুরু হয়ে চলবে সোমবার (২৭ এপ্রিল) পর্যন্ত। মেলার আয়োজক ও ব্যবসায়ীরা জানান, রসুলপুরের এই জামাই মেলাটি বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম। মেলার তিন দিনে ২ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে।
সরেজমিন মেলায় গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন দোকানিরা। মেলায় বিভিন্ন ধরনের খেলনা, প্রসাধনী, কাঠের ফার্নিচার, খাবারের দোকান, মিষ্টির দোকানসহ ছোট-বড় দোকান বসেছে। বৈশাখের ভ্যাপসা গরমের মাঝেও মেলায় জামাই ও বউ ছাড়াও হাজারো মানুষের ঢল নেমেছে। কেউ ঘুরছেন আবার কেউ বিভিন্ন পণ্য কিনছেন। মেলায় আসতে পেরে খুশি দর্শনার্থীরা।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় দেড় শ বছর ধরে সনাতন পঞ্জিকা অনুসারে প্রতিবছর ১১, ১২ ও ১৩ বৈশাখ রসুলপুরে মেলা বসে। এই মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের অন্তত ৩০ গ্রামের জামাইয়েরা শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে আসেন। তারাই মেলার মূল আকর্ষণ। অন্তত ১৫০ বছর যাবৎ এ মেলা চলে আসছে। খাবারের দোকান, মিষ্টিজাতীয় পণ্যের দোকানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের খেলনা, প্রসাধনীর দোকানও বসেছে মেলায়। বড়দের পাশাপাশি ছোট ছেলেমেয়েরা এই মেলায় এসেছে। এ মেলায় আসতে পেরে খুশি দর্শনার্থীরা। মেলায় প্রায় ৫ শতাধিক ব্যবসায়ী এসেছেন তাদের পণ্য নিয়ে।
মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের অন্তত ৩০ গ্রামের বিবাহিত মেয়েরা তাদের স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসেন। আর মেলা উপলক্ষে জামাইকে বরণ করে নেওয়ার জন্য শ্বশুর-শাশুড়িরাও বেশ আগে থেকেই নেন নানা প্রস্তুতি। ঐতিহ্য অনুযায়ী মেলার সময় শাশুড়িরা মেয়ের জামাইয়ের হাতে কিছু টাকা দেন। সেই টাকা দিয়ে জামাই মেলা থেকে সবার জন্য বাজার করেন। এ কারণেই মেলাটি ‘জামাই মেলা’ হিসেবে পরিচিত।
মেলায় ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিবছর আমরা এই মেলা জন্য অপেক্ষা করি। এই মেলায় তাদের উৎপাদিত পণ্য অন্যান্য মেলার তুলনায় বেশি বিক্রি হয়। এ বছরও ভালো ব্যবসা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ব্যবসায়ীরা।
মেলায় জিলাপি বিক্রেতা নুরু মিয়া জানান, দীর্ঘ ১৬ বছর যাবৎ এই জামাই মেলায় আমি জিলাপি তৈরি করে বিক্রি করছি। টাঙ্গাইলের অন্যান্য মেলার চেয়ে এ মেলায় ক্রেতা বেশি থাকায় বিক্রি আল্লাহর রহমতে ভালো হচ্ছে।
দর্শনার্থী জুয়েল রানা বলেন, মেলাটি জামাই মেলা নামে পরিচিত। মেলাটিকে কেন্দ্র করে এই এলাকার জামাইরা একত্রিত হয়। এমন মেলায় আসতে পেয়ে খুবই আনন্দিত।
জামাই মেলায় বেড়াতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী বিথী আক্তার বলেন, প্রায় দেড় শ বছর ধরে এই মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এলাকার মানুষের কাছে ঈদ বা পূজা-পার্বণের মতোই এই মেলা একটি উৎসব। মেলাটি বৈশাখী মেলা হিসেবে শুরু হলেও এখন এটি জামাই মেলা হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে।
স্থানীয় রসুলপুর গ্রামের রফিক মিয়া বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখনও দাদার কাছে এই মেলার কথা শুনেছি। এটি টাঙ্গাইল জেলার মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও বড় মেলা।
কালিহাতি থেকে আসা জামাই রুহুল আমীন বলেন, প্রতিবছরই আমরা শ্বশুরবাড়ি থেকে মেলায় আসার দাওয়াত পাই। এই মেলা আমাদের জামাইদের কাছে খুব আকর্ষণীয়। মেলাকে কেন্দ্র করে অনেক আত্মীয়র সঙ্গে দেখা হয়, তাদের সঙ্গে ভাব বিনিময় হয়। সব মিলিয়ে আমরা মেলার এই তিন দিন আনন্দে মেতে উঠি।
টাঙ্গাইল সদর মডেল থানার ওসি মো. রুহুল আমিন জানান, মেলায় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে স্থানীয় ভলানটিয়ারসহ পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে।
মেলা কমিটির আহ্বায়ক ও গালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও উৎসবমুখর পরিবেশে মেলা শুরু হয়েছে। মেলা সফল করতে সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছেন দোকানিরা। তারা খাবারের দোকান, মিষ্টিজাতীয় পণ্যের দোকানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের খেলনা, প্রসাধনীর দোকানও দিয়েছেন মেলায়। এ ছাড়াও মেলায় একাধিক ফার্নিচারের দোকানও বসেছে। তিন দিনে মেলায় দুই কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।