ঢাকা | 05 August 2026

টাঙ্গাইলে বেড়েছে কিশোরদের মাদকের আসক্তি, ইয়াবা-গাঁজায় জড়িয়ে বাড়ছে অপরাধ

স্টাফ রিপোর্টার, .
নিউজ প্রকাশের তারিখ :Aug 5, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: ছবির ক্যাপশন:
ad728

আরমান কবীর

টাঙ্গাইল পৌর শহরে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ কিশোরদের মাদকাসক্তি আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। বিশেষ করে ভয়ংকর মাদক ইয়াবা ও গাঁজা সেবনে জড়িয়ে পড়ছে তারা। ফলে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে এই কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ। প্রশাসনের কড়াকড়ি ও অভিযান থাকলেও থামানো যাচ্ছে না মাদক সেবনের প্রবণতা। আর এর জেরে শহরে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌর শহরের ক্যাপসুল মার্কেট, কেন্দ্রীয় ঈদগাহ, বেড়াডোমা ব্রিজ পার, টাঙ্গাইল আউটার স্টেডিয়াম, হাউজিং মাঠ, সবুর খান টাওয়ারের সামনের রাস্তা, ছয়আনি পুকুরপাড়, টাঙ্গাইল সরকারি বিন্দুবাসিনী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পেছনের বড় পুকুরপাড়, শহীদ স্মৃতি পৌরউদ্যানের পেছনের নজরুল সেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তাসহ পুরো গলি, পরিত্যক্ত ভাসানী হল চত্বর, কান্দাপাড়া, বাজিতপুর টেক্সটাইল মোড়, রাবনা বাইপাস ও সৌখিন মৎস্য শিকারি সমিতির পাশের লেকপাড়সহ শহরের বিভিন্ন স্থানে সন্ধ্যার পর মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এসব আড্ডায় মাদক সেবনের পাশাপাশি চলে মুঠোফোনে জুয়া খেলা। 

মাদকাসক্ত কিশোরেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন নামে গ্রুপ খুলে নিজেদের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কোনো অভিযানের খবর এসব গ্রুপের মাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। কোথায় মিলিত হতে হবে কিংবা কোন মাদক সহজলভ্য—এমন তথ্যও এসব গ্রুপের মাধ্যমে পেয়ে যায় তারা। 

এ ছাড়া শহরে মাদকের সংকট দেখা দিলে তা সংগ্রহের জন্য মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা যোগে তারা ছুটে যায় শহরতলির গালা ইউনিয়নের মনতলা, মগড়া ইউনিয়নের ছোট বাসালিয়া, ঘারিন্দা রেলস্টেশন, সন্তোষ, দাইন্না ইউনিয়নের শ্যামার ঘাট, অলোয়া জমিদারবাড়ির চারপাশ ও বাইপাস এলাকায়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক বিক্রেতা জানান, এখন আর মাদক বিক্রির নির্দিষ্ট কোনো স্পট নেই। মুঠোফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়। তরুণদের কাছে এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদা ইয়াবা ও গাঁজার। তিনি দাবি করেন, অর্ডার পেলে পৌর এলাকার যেকোনো স্থানে ৩০ মিনিটের মধ্যে মাদক পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, তবে দূরত্ব অনুযায়ী যাতায়াত খরচ ধরা হয়। 

শহরের একটি নামকরা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, আদালত পাড়ার এক বন্ধুর প্ররোচনায় সে ইয়াবা সেবন শেখে। ইয়াবা না পেলে গাঁজা সেবন করে। এখন মাদক ছাড়া তার দিন চলে না। এমনকি পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগেও মাদক সেবন করতে হয়, না হলে মাথা কাজ করে না। 

সে আরও জানায়, বেশ কিছুদিন ধরে প্রশাসনিক কড়াকড়ির কারণে মাদক পাওয়া কিছুটা কঠিন হচ্ছে এবং দামও বেড়েছে। তাই সে এই পথ থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। 

টাঙ্গাইল আউটার স্টেডিয়ামের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রতিদিনই ঈদগাহ মাঠে মাদকের জমজমাট আড্ডা বসে। শহরের বিভিন্ন এলাকার কিশোর-যুবকেরা এসে গভীর রাত পর্যন্ত মাদক সেবন ও জুয়ায় মেতে থাকে। মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান চালালে কিছুদিন বন্ধ থাকে, তবে পরে আবার আগের চিত্র ফিরে আসে। 

এ প্রসঙ্গে সরকারি সৈয়দ মহব্বত আলী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, "সরকার ইদানীং মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের বিরুদ্ধে তৎপর। তবে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চা জরুরি।" 

টাঙ্গাইল সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি আকিবুর রহমান ইকবাল বলেন, "অতীতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কথিত 'বড় ভাইদের' আশ্রয়-প্রশ্রয়েই কিশোর গ্যাং তৈরি হয় এবং তারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। এই অপসংস্কৃতি থেকে বের হতে কিছুটা সময় লাগবে। বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি নিয়ে এগোচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।" 

এ বিষয়ে জানতে টাঙ্গাইল জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আহসান কবীর বুলবুলের মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। 

কিশোরদের মাদকাসক্তি ও অনলাইন গেমের প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার কারণে শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সচেতন নাগরিক সমাজ। তারা দ্রুত কার্যকর প্রশাসনিক অভিযান ও সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ