টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার শোলাপ্রতিমা গ্রামে অবস্থিত শহীদ আব্দুর রকিব বীর বিক্রম উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ রেজুলেশন বই গায়েব করার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০১৩ সালে ভুয়া পরীক্ষার্থী কেলেঙ্কারি ও সেই সময় বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি আড়াল করতেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বসংক্রান্ত রেজুলেশন সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এ ঘটনায় মৃত শিক্ষক আবুল হোসেনের ছেলে সাকিব আল হাসান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বাবা দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও বিদ্যালয়ের অনার বোর্ডে তাঁর নাম নেই। বিষয়টি জানতে গিয়ে তিনি রেজুলেশন বই গায়েব হওয়ার তথ্য পান।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক আজহারুল ইসলাম ২০০৩ সালের ১৫ জুলাই যোগদান করেন। ২০১৩ সালের এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে ওই বিদ্যালয়ের চারজন ভুয়া পরীক্ষার্থীকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত সাজা দেন। এ ঘটনায় তৎকালীন পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব ও সখীপুর পিএম পাইলট মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহাদুল্লাহ মিয়া বাদী হয়ে আজহারুল ইসলামকে আসামি করে সখীপুর থানায় মামলা করেন।
মামলার পর গ্রেপ্তার এড়াতে আজহারুল ইসলাম আত্মগোপনে চলে গেলে বিদ্যালয়ে তাঁর অনুপস্থিতির মধ্যে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভায় জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। পরে তিনি প্রায় তিন মাস দায়িত্ব পালন করেন বলে দাবি তাঁদের।
২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় আবুল হোসেন মারা যান। সম্প্রতি তাঁর ছেলে সাকিব আল হাসান বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকদের অনার বোর্ডে বাবার নাম না দেখে বিস্মিত হন। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আজহারুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'তোমার বাবা কখনোই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন না।'
সাকিব আল হাসান বলেন, 'আমাদের বাড়িতে বাবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের রেজুলেশনের ফটোকপি সংরক্ষিত আছে। প্রধান শিক্ষক তাঁর অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভুয়া পরীক্ষার্থীর মামলার বিষয়টি আড়াল করতেই ওই সময়কার রেজুলেশন সরিয়ে ফেলেছেন।'
বিদ্যালয়ের একাধিক সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিজ বাড়িতে সংরক্ষণ করেন এবং একক সিদ্ধান্তে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাঁদের দাবি, আবুল হোসেন তিন মাসেরও বেশি সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিমা বংকী একতা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাফর ইকবাল বলেন, 'আবুল হোসেন অবশ্যই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভায় তিনি অন্য প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন। বিষয়টি উপজেলার অনেকে প্রধান শিক্ষকেরাই জানেন।'
তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি সদস্য সালাহ উদ্দিন, যিনি বর্তমানে বহেরাতৈল উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তিনি বলেন, 'প্রধান শিক্ষক মামলার আসামি হওয়ায় ম্যানেজিং কমিটির সভায় আবুল হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ওই রেজুলেশন আমি নিজের হাতে লিখেছি। এখন শুনছি সেই রেজুলেশন খাতা গায়েব করা হয়েছে।'
এদিকে বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক অভিযোগ করেন, আজহারুল ইসলাম বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে চাকরি শেষে অবসর ভাতা গ্রহণের পাশাপাশি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক হিসেবেও বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। একই ব্যক্তি একসঙ্গে দুটি সরকারি সুবিধা নিতে পারেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
উপজেলার ডনডনিয়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, '২০১৩ সালের ভুয়া পরীক্ষার্থীর মামলায় আজহারুল ইসলাম ছিলেন এক নম্বর ও আমি ছিলাম দুই নম্বর আসামি। আমি আদালতে আত্মসমর্পণ করতে গিয়ে জেলও খেটেছি। আজহারুল ইসলাম মাস দুয়েক পালিয়ে থাকার পর তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছিলেন। আজহারুল ইসলাম আত্মগোপনে থাকার সময়কালে আবুল হোসেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। অনার বোর্ডে তাঁর নাম না থাকায় আমরাও বিস্মিত।'
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক আজহারুল ইসলাম বলেন, 'আবুল হোসেন কখনোই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেননি। আমি কখনো বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতও থাকিনি।' তবে রেজুলেশন বই গায়েবের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি।দুটি ভাতা গ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, 'নৌবাহিনীতে চাকরি শেষে অবসর ভাতা গ্রহণ করছি, এটা সত্য। আগের চাকরি ছিল সরকারি, আর এখনকার চাকরি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে। সরকার যদি না দেয়, তাহলে অবসর ভাতা নেব না।'
এ বিষয়ে সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম বলেন, 'সাকিব আল হাসান নামের এক ব্যক্তির অভিযোগ পেয়েছি। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'