ঢাকা | 10 March 2026

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি ...ফকির মাহবুব আনাম

স্টাফ রিপোর্টার, .
নিউজ প্রকাশের তারিখ :Mar 10, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: ছবির ক্যাপশন:
ad728
আগামী মাসে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ফুয়েল লোড করা হবে। এরপর জুনের মধ্যে রূপপুর থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল) এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশে বহুদিন ধরে গ্যাসের সংকট চলছে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সংকট আরো তীব্র হতে পারে। এ পরিস্থিতির মধ্যে রূপপুর উৎপাদনে আনা গেলে বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই মোকাবেলা করা সম্ভব, যা লোডশেডিং বড় আকারে কমিয়ে দিতে পারে। রূপপুর প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রূপপুরের প্রথম ইউনিটের হট রান, কোল্ড রানসহ যাবতীয় পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে। এখন ইন্সপেকশন কার্যক্রম চলবে। এরপর ফুয়েল লোড করা হবে। তারপর পাওয়ার স্টার্টআপ শুরু হবে। শুরুতেই ৩০০ মেগাওয়াট গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হবে।
দেশের বৃহৎ ও উন্নত প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিদর্শনে যান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। পরিদর্শনে গিয়ে তিনি রূপপুরের বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশে যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে জানান মন্ত্রী। দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই প্রথম রূপপুর প্রকল্পে আনুষ্ঠানিক সফর মন্ত্রীর। তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। এ উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন স্থাপনাটি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে।
দেশের ইতিহাসে ব্যয়বহুল এ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয়, নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ নানা ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। তবে কেন্দ্রটি বাস্তবায়ন ও চালু করা গেলে তা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ সংকট মোকাবেলার পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমার বিষয়টি অস্বীকার করেননি জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা।
রূপপুর প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শুরুতেই নির্মাণ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। তবে এখন খরচ বেড়ে এ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায়। সর্বশেষ এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যয় ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। আর প্রকল্প বিলম্বের কারণ হিসেবে কভিড মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ আন্তর্জাতিক নানা সংকটের কারণে প্রকল্পে সময়মতো মালপত্র না পৌঁছানো এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে বারবার উৎপাদনের সময়সীমা পেছাতে হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। মূল চুক্তিতে নির্ধারিত সময় ছিল প্রথম ইউনিটের জন্য ২০২৩ সালের অক্টোবর আর দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ২০২৪ সালের অক্টোবর। এখন নতুন চুক্তিতে প্রথম ইউনিটের জন্য ২০২৬ সালের ডিসেম্বর আর দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ২০২৭ সালের ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ নিয়ে গত বছরের ২০ জুন রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন।
রূপপুর চালুর সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর লক্ষ্যে যাবতীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হয়েছে। আগামী এপ্রিলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ফুয়েল লোড করা হবে। এরপর জুনে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হবে। পর্যায়ক্রমে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ গ্রিডে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। এরই মধ্যে পিজিসিবি গ্রিড লাইন প্রস্তুত করে ফেলেছে। বিপিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রম সমন্বয় করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুতের ফ্রিকোয়েন্সি, লোড ম্যানেজমেন্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।’
দেশে গ্রীষ্ম মৌসুমে প্রতি বছর সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে বিদ্যুতের তীব্র চাহিদার মৌসুমে ব্যয়বহুল জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহার করলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বহুলাংশে বেড়ে যায়। গ্রীষ্ম মৌসুমে অন্তত আড়াই-তিন হাজার মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। রূপপুর চালু করে অন্তত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সরবরাহ দেয়া গেলে তা ব্যয়বহুল জ্বালানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর চাপ কমাবে। এতে বিপিডিবির ব্যয়ও কমবে। বিপিডিবির এরই মধ্যে রূপপুরের বিদ্যুৎ নেয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। রূপপুরসংশ্লিষ্ট যাবতীয় সঞ্চালন লাইনের কাজ এরই মধ্যে শেষ করেছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি।
এ বিষয়ে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহিদুল হাসান বলেন, ‘আমরা ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় হট রান, কোল্ড রান ও যাবতীয় পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করেছি। গত মাসেই সব পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বর্তমানে সবকিছু নিখুঁত আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে কিছু যন্ত্রপাতি খুলে চূড়ান্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ মাসের মধ্যেই পরিদর্শন শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সব নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যায়, তাহলে আগামী মাসেই ফুয়েল লোডিং শুরু হতে পারে।’


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ