‘পরথমে গাছের গোড়া পরিষ্কার করে। তারপর গজারীগাছের ছাল এক দেড় ফুট তুইলা ফালায়। এরপর মাটি চাপা দিয়া গাছের গোড়া ঢাইকা দেয়। এক দেড় মাসের মধ্যেই ওই গাছ মইরা যায়। এইডা হইলো গজারিগাছ মাইরা ফালানোর প্রসেস। যারাই আনারস কলা বাগান করে তারাই এই প্রসেসে বাগানের আগাছা পরিষ্কারের সাথে সাথে গজারীরগাছ পরিষ্কার করে।’ গজারীগাছ ধ্বংসের এমন বর্ণনা দেন বন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বনবিভাগের অনুমোদিত সংগঠন কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট কমিটির (সিএমসি) দোখলা অঞ্চলের সভাপতি মো. মোতালেব হোসেন।
বন ধ্বংসের অভিনব এই কৌশল মধুপুর বনের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জ্ঞাত থাকলেও রহস্যজনক কারণে তারা নিরব থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই অপকর্মে সহযোগিতা করেন অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারি, সিএমসি সদস্য ও জবরদখলকারীরা। ফলে তলানিতে টিকে থাকা মধুপুর বনের ৬ হাজার ৭৬৫ একর প্রাকৃতিক বনও নিঃশে^ষ হয়ে যাচ্ছে। তার প্রমাণ কৃষি বিভাগের হিসেবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মধুপুর বনাঞ্চলে প্রধান অর্থকরী ৭টি ফসলের আবাদ হয়ে থাকে ২৯ হাজার ২২৪ একর বনভূমিতে। এছাড়াও আবাদ হয়ে থাকে প্রায় দেড় শতাধিক ফসল এই বনাঞ্চলের একরের পর একর বনভূমিতে।
যে সময়ে সরকার শাল-গজারীর চারা দিয়ে বন সৃজনের উদ্যোগ নিয়েছে সেই সময় গজারীগাছ নিধনের অভিনব কৌশলে হতভম্ব বিজ্ঞজনেরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মধুপুর শালবনের আয়তন ৪৫ হাজার ৫শ' ৬৫ একর। এই বনে শাল-গজারীসহ ৬৩ প্রজাতির গাছের পাশাপাশি ভেষজগুল্ম লতায় ভরা ছিল। এতে চিতাবাঘ, হরিণ, বানর, হনুমানসহ অন্তত ২০ প্রকার প্রাণি ও বিষধর সাপের বিচরণ ছিল। বঙ্কিম চন্দ্রের আনন্দ মঠের বর্ণনামতে, ‘মধুপুর বনের ঘন পত্রপল্লব ভেদ করে সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছাত না।’
এমন ঘন বন আজ বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের দখলবাজি, তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারি, স্থানীয় প্রশাসন ও বনদস্যুদের সম্মিলিত বৃক্ষপাচার আর অপরিনামদর্শী সরকারি প্রকল্পের কারণে। সামাজিক ও অংশীদারিত্বের বনায়নের নামে বনখেকোদের বৈধতা দেওয়ায় মধুপুর বন ধ্বংস তরাণি¦ত হয়েছে।
বনবিভাগের দাবি অনুসারে ৪৫ হাজার ৫৬৫ একর বনভূমির মধ্যে প্রাকৃতিক বন ৬ হাজার ৭৫৬ একর। সামাজিক বন ৬ হাজার ১৭৯ একর। আর ৮ হাজার ৩৩২ জন দখলকারীরা দখলে রেখেছে ১৯ হাজার ১৩৫ একর বনভূমি। ৭ হাজার ৮শ একর জুড়ে রয়েছে রাবার বাগান। এই হিসাব অনুসারে ২৬ হাজার ৯৩৫ একর বনের জমি বেহাত রয়েছে। এছাড়া সামাজিক বনায়ন পুরুটাই আনারস, কলাসহ বিভিন্ন ফসলের মাঠে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রাকৃতিক বনের গজারীগাছ ধ্বংসে মেতে উঠেছে অসাধু ব্যক্তিরা। দোখলা রেঞ্জের আমলীতলা ভুটিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামে গজারী গাছের গোড়ার ছাল তুলে কান্ডে এসিড দিয়ে গাছ মেরে বনভূমি জবরদখল করে কৃষিভূমিতে পরিণত করা হচ্ছে। বিশালাকারের অর্ধশত বছরের পুরনো গজারী গাছগুলো অসহায় অবস্থায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এক সময়ের ঘন আরণ্যক অঞ্চল আমলীতলা কলা আর আনারস বাগানে পরিণত হয়েছে। দোখলা যাওয়ার পথে ওই গ্রামের বাইদের উজানে ডান পাশে সিনাটান করে দাড়িয়ে আছে গজারীগাছ। প্রতিটি গাছের গোড়া মাটি চাপা দেওয়া। কিছু অংশে ঠিকাদাররা পাথর ও পিচের ড্রাম রেখে দিয়েছে। মাস দেড়েক আগেও এই জায়গায় শাল গজারীগাছের নিচে ছিল আনারস বাগান। আশপাশেও পাতাঝরা এই বনের পাতা মাটিতে পরেনা। পরে আনারস গাছের উপর। বনবিভাগের সহযোগিতায় সবই দখলদারদের হেফাজতে। দখলদাররা গজারী বনের ভেতরে ফাঁকা জায়গাগুলোতে আনারস আবাদ করেছে। ওই বাগান পরিষ্কার করার সময় কৌশলে বড় বড় গাছও পরিষ্কার করেন তারা।
ঠিকাদারের ভাড়া নেওয়া জায়গার গজারী গাছগুলোর গোড়া মাটির ঢিবি দিয়ে ঢাকা। ওই ঢিবির মাটি সড়ানোর পর বেরিয়ে আসে গজারী গাছ হত্যার রহস্য। প্রতিটি গজারীগাছের গোড়া এক-দেড় ফুট ছাল তুলে ফেলা হয়েছে। যাতে করে দ্রুত গাছ গুলো মরে যায়। পরে মরাগাছ সরিয়ে পুরো জায়গা সুন্দরভাবে দখলদারদের ব্যবহারের উপযোগি হয়ে উঠে।
ঠিকাদারের প্রতিনিধি মো. হারুণ অর রশিদ জানান, আমি এবং মনির হোসেন দুজনে মিলে মধুপুর দোখলা সড়ক উন্নয়নের কাজটি সাব-কন্ট্রাক নিয়েছি। নির্মান কাজের উপকরণ রাখার জায়গা না থাকায় আমলীতলায় মরে যাওয়া আনারস বাগান ভাড়া নিয়েছি। ওই জমির আনারস চাষী শাহাজাহানকে গাছ পরিষ্কার করার জন্য ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। তারা গাছ পরিষ্কার করে দিয়েছে। আমরা বনবিভাগের সাথে আলোচনা করে নির্মানকালীন সময়ের জন্য জায়গাটুকু ব্যবহার করছি।
স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গজারী গাছ কাটা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। তাই গজারী গাছ নিধনে নতুন কৌশল নিয়েছে বন কর্মচারি, সিএমসি সদস্য ও দখলদাররা। অসাধু এই ব্যক্তিরা বনের জায়গা ফাঁকা করে বিঘাপ্রতি ভাড়া দেয়। তারা প্রতি বিঘা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে। এজন্য তারা প্রথমে গজারী গাছের ছাল (চামড়া) গোড়া থেকে এক দেড়ফুট পর্যন্ত চারদিকে তুলে ফেলে। তারপর গাছের কান্ডে হাতুড়ী বা কুঠার দিয়ে আঘাত করে থেতলে এসিড দিয়ে দেয়। পরে গাছের গোড়ায় মাটি ও আবর্জনা দিয়ে ঢেকে দেয়। যাতে করে গ্যাস সৃষ্টি হয়ে দ্রুত গাছ মরে যায়। আর এই পদ্ধতিতে একটি গাছ দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে মরে যায়। পরে মরে যাওয়া গাছ বনবিভাগ সরিয়ে নেয় অফিসিয়াল দায়িত্বের অংশ হিসেবে।
মধুপুর বনাঞ্চলের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, কয়েক বছর ধরেই দখলদাররা গাছের চামরা ছিলে গজারীগাছ মেরে ফেলছে। আনারস-কলাচাষী, বনের অসাধু কর্মচারী ও দখলদার এবং সামাজিক বনায়নের প্লটধারীরা এই ভাবে বনের গজারী গাছ ধ্বংস করে থাকে।
এ ব্যাপারে দোখলা রেঞ্জের কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন বলেন, আমরা ঘটনাস্থল দেখে এসেছি। জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাৎক্ষণিক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারিনি স্থানীয়দের হামলার ভয়ে। আমরা বনবিভাগের কয়েকজন কর্মচারি অসহায়। কিছু বললেই স্থানীদের হামলার ভয় থাকে। সম্প্রতি প্রধান বনসংরক্ষকসহ অনেকেই আহত হয়েছেন স্থানীয়দের হামলায়। সার্বিক বিষয় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তার পরামর্শমোতাবেক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এ ব্যাপারে মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারি বন সংরক্ষক আশিকুর রহমান এরসাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।