নির্বাচনে গণরায় নিয়ে যে সংসদে গিয়ে জনতার কণ্ঠস্বর হতে চেয়েছিলেন শরিফ ওসমান হাদি, সেই প্রাঙ্গণ থেকেই লাখো মানুষের অশ্রু ও শ্রদ্ধায় চিরবিদায় নিয়েছেন তিনি। হাদি চলে গেলেও জানাজায় সমবেত জনতা ‘আমরা সবাই হাদি হবো, যুগে যুগে লড়াই করব’ স্লোগানে তাঁর আদর্শ ধারণের অঙ্গীকার করেন। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠান গড়ার ডাক দেওয়া এই তরুণের মরদেহ সামনে রেখে লাখো মানুষ আপসহীন সংগ্রামের শপথ নেন।
গতকাল শনিবার দুপুরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির জানাজার চিত্র ছিল এমনই। লাখ লাখ মানুষ অশ্রুবাষ্প চোখে হাদির জন্য দুই হাত তুলে দোয়া করেন। তখন কান্নার রব ওঠে কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত স্মরণকালের অন্যতম বৃহত্তম জানাজায়। এই আবেগ ছুঁয়ে যায় নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও। দায়িত্ব পালনের গুরুভার কাঁধে তারাও ছিলেন অশ্রুসিক্ত।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা হলেও মানুষের ভিড় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ফার্মগেট, আসাদ গেট ও বিজয় সরণি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কয়েক লাখ মানুষ শেরেবাংলা নগরে ভিড় করেন। ভিড়ে অনেকে জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। ছবি বিশ্লেষণের বিভিন্ন সফটওয়্যার অনুযায়ী, হাদির জানাজায় ১০ থেকে ১৪ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। জানাজার পর সংসদ ভবন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছিল জনস্রোত। লাল-সবুজ পতাকায় মোড়ানো হাদির কফিন বহনকারী গাড়িটি ভিড়ে বারবার আটকে যাচ্ছিল। ‘আপস না সংগ্রাম: সংগ্রাম সংগ্রাম’ স্লোগানে মুখরিত ছিল পুরো রাজপথ।
জনস্রোত সামলাতে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়। সেখানে হাদির পরিবারের সদস্য, জুলাই অভ্যুত্থানের সহযোদ্ধা ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের উপস্থিতিতে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
হাদির জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, গণঅধিকারের সভাপতি নুরুল হক নুর, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ নানা দল ও মতের জ্যেষ্ঠ নেতারা এতে অংশ নেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন জানাজায়।
মাথা নত করবে না বাংলাদেশ
জানাজার আগে প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘প্রিয় ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসিনি। তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছো। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন তুমি সব বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে। এটা কেউ সরাতে পারবে না।’
ড. ইউনূস বলেন, ‘আজ হাদির কাছে ওয়াদা করতে এসেছি। তুমি যা বলে গেছো, সেটা যেন আমরা পূরণ করতে পারি।’ হাদির মানবপ্রেম, মানুষের সঙ্গে তাঁর সহজ সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এসব গুণের জন্য সবাই আজ তাঁর প্রশংসা করছে।
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক
জানাজার আগে হাদির ভাই আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, ‘আমার ভাই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য দেশের কোটি মানুষকে বার্তা দিয়েছিল। আজকে বলার কোনো ভাষা নেই। ছোট ভাইয়ের আট মাসের সন্তান আছে। হাদি বলেছিল, সন্তানের এমন নাম রাখতে, যার মধ্যে বিপ্লবী চেতনা ও সাহসিকতা থাকবে। ওর সন্তানের নাম দিয়েছিলাম ফিরনাস, অর্থ বিপ্লবী ও সাহসী।’
হাদির খুনিদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সাত দিন হয়ে গেল! প্রকাশ্যে খুন করে যদি পার পেয়ে যায়, এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু নেই। যদি সীমান্ত পেরিয়ে খুনিরা চলে যায়, তাহলে কেমন করে গেল– এই প্রশ্ন জাতির কাছে রেখে গেলাম।’ কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘হাদির সন্তান কোনো দিন বাবার স্মৃতি বলতে পারবে না।’
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘আমরা এখানে কি শুধু কান্নার জন্য এসেছি? ভাইয়ের রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য জানাজায় দাঁড়িয়েছি। সরকার কি এখনও স্পষ্ট করে জানিয়েছে খুনি কোথায় আছে? আমরা মনে করছি, এখানে খুনি একজন নয়, একটি চক্র কাজ করেছে।’ খুনের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চেয়ে জাবের বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী গত এক সপ্তাহে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা জানাতে হবে।’
হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে কারও প্ররোচনায় সহিংসতায় না জড়ানোর আহ্বান জানিয়ে জাবের বলেন, ‘ইনকিলাব মঞ্চ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি জানানো হবে।’
দাফনের পর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বানে হাদির সমর্থক-অনুসারীরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। হাদি হত্যার বিচারে অগ্রগতি কী এবং খুনিদের অবস্থান কোথায়, তা জানাতে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন তারা। এই সময়ের পর ফের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে অবরোধ তুলে নেন বিক্ষোভকারীরা।
সকাল থেকে মানুষের স্রোত
জানাজা শুরু হতে তখনও প্রায় চার ঘণ্টা বাকি। সকাল থেকে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ যেন ধীরে ধীরে রূপ নেয় জনসমুদ্রে। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দুপুর দেড়টার আগে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মিরপুর, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, উত্তরাসহ ঢাকার নানা প্রান্ত থেকে হেঁটে এসেছেন মানুষ। দূরদূরান্তের অনেকে রাতেই রওনা হন।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে আসা তরুণ আবু বকর বলেন, ‘বীর সৈনিকের মৃত্যুর পর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি।’ গাজীপুরের শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদের গায়ে লাল পতাকা। তিনি বলেন, ‘হাদি ভাইয়ের হত্যার বিচার না হলে আমরা কেউ নিরাপদে থাকব না।’
রাজধানীর বনশ্রীর ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘মনে হয়, হাদি আমার ভাই। জীবনে জানাজায় এত মানুষ দেখিনি।’বেলা ১১টার পর থেকে মেট্রোরেলের ফার্মগেট ও বিজয় সরণি স্টেশনে ছিল উপচে পড়া ভিড়। দুপুর ১টার দিকে রাজশাহী থেকে আসা শিক্ষার্থী তানকিন ইসলাম বলেন, ‘শুধু এই জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য রাজশাহী থেকে রাতের বাসে এসেছি।’ টেকনাফ থেকে আসা আব্দুল জলিল ও নারায়ণগঞ্জের তাকরিম আহমেদও হাদিকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন।
বিকেল ৩টা ৪ মিনিটে হাদির কফিনবাহী গাড়ি র্যাব ও পুলিশের কঠোর নিরাপত্তায় সমাধিস্থলে পৌঁছায়। কফিন বহন করে কবরের কাছে নিয়ে আসেন হাসনাত আবদুল্লাহ, সাদিক কায়েমসহ ছাত্রনেতারা। ৩টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে হাদিকে দাফন করার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন সহযোদ্ধা ও স্বজনরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মামুন আহমেদ, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও শিবির সভাপতি জাহিদুল ইসলামসহ কয়েকজন হাদিকে কবরে নামান।
উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘হাদির আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।’
দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর হাদির কবরে সমাধিলিপি স্থাপন করা হয়। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি। (১৯৯৩-২০২৫)। শাহাদাত: ১৮ ডিসেম্বর-২০২৫।’
হাদির জানাজা ও দাফন ঘিরে ছিল কড়া নিরাপত্তা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। শাহবাগ মোড়ে জামায়াতের নেতা শাহিন আহমেদ খান বলেন, এক হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেছেন। দাফনের সময় ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রাতে ডিএমপির পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানাজা ও দাফন সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
নির্বাচনী জনসংযোগের সময় ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদিকে ১২ ডিসেম্বর দুপুরে গুলি করে আততায়ী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানকে এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নত করেছে। তবে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। গুরুতর আহত হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ১০টায় তিনি মারা যান।