শুধু গৌরীপুর নয়, জেলাজুড়েই হরিলুটের চিত্র জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের। গৌরীপুরে কাজ ছাড়াই ভুয়া-বিল ভাউচারে কোটি টাকার উত্তোলনের দুর্নীতি খোঁজতে গিয়ে বেড়িয়ে এলো জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর প্রতি গর্তে (প্রকল্পে) থাকা দুর্নীতির সেই কালো সাপ! দুর্নীতির বরপুত্র বির্তকিত সেই প্রকৌশলী জামাল হোসেন ময়মনসিংহে আবারও ফিরতে কোটি টাকার লবিস্ট নিয়োগের সেই চুক্তিপত্রের তথ্যও ফাঁস। চুক্তিনামার কপি ও তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি ঢাকতে ফ্যাসিস্টের আস্থাভাজন প্রকৌশলী জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই শেরপুরে বদলী করে দায়সারে এ দপ্তর!
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে শেরপুরে কর্মরত) প্রকৌশলী জামাল হোসেন সাংবাদিকদের জানান, কাজ ছাড়া কাউকে বিল দেয়ার সুযোগ নেই। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের রির্পোটের প্রেক্ষিতেই বিল দেয়া হয়। আর এসব কাজ সম্পর্কে জানতে বর্তমানে ময়মনসিংহে যিনি দায়িত্বে আছেন, তার সাথে যোগাযোগ করুন। অন্য সকল অভিযোগ অসত্য, মিথ্যা বিভ্রান্তিকর।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধিনে ২০২২সনে ৩৮টি নলকূপের কার্যাদেশ দেয়া হয়। এ নলকূপের তথ্য খোঁজতে গিয়ে জানা যায় এ বিভাগের অধিনে মানব সম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্পে এ জেলার ত্রিশাল, ভালুকা, মুক্তাগাছা, গৌরীপুর, ফুলপুর ও হালুয়াঘাট উপজেলার ২২৮ টি সম্ল পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কীমের বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ওই বছরেই কার্যাদেশ দেয়া হয়। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, ২২৮টি নলকূপের চুক্তিমূল্য ছিলো ২৭ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা। এ প্রকল্পের কাজের মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সনের ২ এপ্রিল। এর মধ্যে মাত্র কাজ হয় ৩০ হতে ৩৫ শতাংশ। তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ম্যান এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স লিবার্টি ট্রেডার্স (জেভি) কে ভৌত অগ্রগতির তুলনায় কাজ ছাড়াই ২০২৪ সনে ১২ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা বিল প্রদান করে। তবে এ টাকার বিনিময়েও জনগণের ভাগ্যে জুটেনি কাঙ্খিত পানি। অথচ এ প্রকল্পের প্রতিটি স্কীমের মাধ্যমে ৪০টি পরিবারে পানির লাইপ লাইন স্থাপনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করার কথা ছিলো।
গৌরীপুরে প্রকল্প এলাকা ঘুরে জানা যায়, ৩৮টি স্কীমের মধ্যে মাত্র ২টি স্কীমে পানি উত্তোলন হচ্ছে। এগুলো ব্যবহৃত মালামালও অত্যন্ত নিম্নমানের। এখন পর্যন্ত ৩৬টি স্কীম চালু হয়নি। ফলে প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা ক্ষোভ ফুসছেন। ২নং গৌরীপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. দুলাল মিয়া জানান, বিগত সরকারের আমলে দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে ট্যাংকি ও স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও কেউ পানি পায়নি। কোনাপাড়া গ্রামের জমিদাতা মৃত ইয়াকুব আলীর পুত্র মো. জামাল উদ্দিন জানান, প্রায় ২বছর আগে ঠিকাদারের লোকজন আসছিলো। এখন পর্যন্ত এ স্কীমে পানি উত্তোলন শুরু হয়নি। একই গ্রামের জমিদাতা মৃত সদর আলীর পুত্র শাহজাহান জানান, তার এখানে স্কীম চালু হয়নি। চালুর আগেই কল ভেঙে গেছে, এখনো কলের স্থান পাকাকরণ হয়নি। নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করায় চালু হলেও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার শংকা রয়েছে। একই স্কীমভুক্ত হাবিবুর রহমানের স্ত্রী রহিমা খাতুন জানান, যে নড়বড়ে পাইপ দিয়েছে, তা এখনেই নষ্ট হওয়ার উপক্রম। পানির জন্য আমরা খুব কষ্ট করছি। একই গ্রামের আব্দুল কাদিরের পুত্র আব্দুস সালাম জানান, ২০২৩সনে ট্যাংকি ও কল স্থাপন করা হয়েছিলো। এখন পর্যন্ত পানি সরবরাহ চালু হয়নি। এক ইঞ্চি পাইপের স্থলে হাফইঞ্চি পাইপ দেয়া হয়েছে। এতে চালু হলেও পানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টির শংকা রয়েছে। একই গ্রামের অপর স্কীমের জমিদাতা মৃত ইসমাহিল হোসেনের পুত্র ইয়ার হোসেন জানান, স্কীমও হলো না, সেবাও পেলে না, অযথা যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। আর কিছুদিন পরে তো এসব জিনিসও অচল হয়ে যাবে। একই গ্রামের আমেনা খাতুন বলেন, আমরা এ স্কীমের আশায় থেকে এখন পানির জন্য চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। বোকাইনগর ইউনিয়নের নাহড়া গ্রামের আব্দুল মুন্নাসের পুত্র রফিকুল ইসলামের জমিতে স্থাপিত স্কীমও চালু হয়নি। এ প্রসঙ্গে জাহানারা বেগম বলেন, এই ট্যাংকি দেখছেন, আমরাও এই ট্যাংকি দেখেই আছি, পানি শুধু বের হয় না। একই ইউনিয়নের আব্দুল হক ফকিরের পুত্র মো. সাগর মিয়া ফকির জানান, এক বছর আগে ঠিকদারের লোকজন এসেছিলো, সবকিছুই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানি সরবরাহ চালু হয়নি। ৪০টি বাড়ি বাড়ি ছোট ছোট পাইপ দিয়ে সংযোগ দেয়া হলেও সেখানে পাকাকরণ হয়নি। এগুলোও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীকে অতিরিক্ত বিল প্রদানের জন্য কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াই ২০২৪ সনের সেপ্টেম্বর মাসে এ প্যাকেজটি বাতিল করা হয়। জনগণের টাকায় এ হরিলুটের দায় কার? ভুক্তভোগীরা জানায়, বারবার সরকারি দপ্তরে তাগাদা দিয়েও তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করাতে পারেন নাই।
এ প্রকল্পটির চুক্তি মূল্য ২৭ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকার মধ্যে ঠিকাদারকে পরিশোধিত করেন ১২ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা ফলে প্রকল্পের অপরিশোধিত অর্থ থাকে ১৪ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা। কিন্তু সেই চুক্তির অবাস্তবায়িত কাজ সমাপ্ত করতে বর্ধিত প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে আবার ২০ কোটি টাকার। সরকারের গচ্ছা যাওয়া এই ৫ কোটি ১৫লাখ টাকা গেলো কোথায় ? অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, এ প্রকল্পের ২২৮টি স্কীমের মধ্যে গৌরীপুর, ফুলপুরসহ ৯৯টি স্কীমের কাজ আজও শুরু হয়নি। এছাড়াও ১২৯ টি স্কীম র্দীঘদিন ধরে হাফ-ডান অবস্থায় পড়ে আছে। এ দিকে সরকারের পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এর মনিটরিং রির্পোটে বলা হয়েছে, বাস্তবায়িত কাজের মান খুবই নিম্নমানের।
অপরদিকে এই প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহের গৌরীপুরসহ জেলা সবকয়টি উপজেলায় বিনামূল্যে টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মান করা হচ্ছে। ফুলপুর উপজেলার কাজ অত্যন্ত নিম্নমানের এবং সাধারণ মানুষের উপকারে আসছে না মর্মে দুদকে অভিযোগ করে এলাকাবাসী । এ অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বালিয়া, বওলা ও রহিমগঞ্জ ইউনিয়নের কাজের মান খুবই নিম্নমানের হয়েছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির নাঠের গুরু হিসাবে খ্যাতি পেয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল হোসেন। তার ছত্রছায়া মেকানিক আকরাম হোসেন, কুদ্দুস আলী, আজহার হোসেন ও সানাউল্লাহ এ অনিয়মের মূল কারিগরীতে ন্যস্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কর্মচারী হলেও তারা সকলেই সরাসরি ঠিকাদারি কাজেও জড়িত ছিলেন।
এদিকে এই প্রকল্পের আওতায় মুক্তাগাছা ও গৌরীপুর উপজেলায় দুটি লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কীমের কাজের টেন্ডার দেয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কীমের কাজটির দরপত্রে অংশগ্রহনকারী ঠিকাদারদের মধ্যে একজন হলো গ্লোবাল কন্সস্ট্রাকশন এন্ড সাপ্লাইয়ার-জেভির আব্দুল আওয়াল হিমেল। উক্ত প্রতিষ্টান সূত্র জানায়, তারা কাজটিতে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে ছিলেন এবং কাজটি তাদের দেওয়া হয়নি। ৩য় সর্বনিম্ন দরদাতা মেসার্স নূর এন্ড কোম্পানীকে ১২ কোটি ৬৩ লক্ষ টাকায় দেয়া হয়েছে। অথচ প্রথম সবর্নিম্ন দরদাতা ১০কোটি ৭ লক্ষ টাকায় কাজটি সম্পন্ন করতে চেয়েছিলো। অভিযোগ রয়েছে দুর্নীতির বরপুত্রখ্যাত ওই প্রকৌশলী জামাল হোসেনকে বড় অংকের টাকার ম্যানেজ করে এ কাজ নেন মেসার্স নূর এন্ড কোম্পানী। এতে সরকারের গচ্ছা যায় ২ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গৌরীপুর উপজেলার স্কীমটিতে পাইল ক্যাপ ঢালাই এর কাজ চলছে। মুক্তাগাছা উপজেলার স্কীমটিতে সবেমাত্র পাইল কাস্টিং সম্পন্ন হয়েছে। স্কীমে জমিদাতা একজনকে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি জানান যে শুনেছি অর্ধেকের চেয়ে বেশি টাকার অগ্রিম বিল উত্তোলন করে নিয়েছে। যার দরুন কাজ বাস্তবায়নে ঠিকাদারের আগ্রহ কম। এ প্রকল্পের কার্যাদেশ দেয়া হয় ২০২৪ সনের আগস্টে। কাজটি ১৮ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার নিয়ম থাকলেও এখনো ৮৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়নি। তারপরেও এ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ৫৩ শতাংশ চলতি বিল প্রদান করেন ওই প্রকৌশলী জামাল হোসেন। গৌরীপুরের দুটি প্রকল্পে মধ্যে একটি প্রকল্পের মাত্র কাজ শুরু হয়েছে। আর বোকাইনগর ইউনিয়নের নাহড়া বাজার এলাকায় এখনও কাজ শুরু হয়নি। প্রকৌশল দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, এ প্রকল্পেরও প্রায় অর্ধেক টাকা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ না করেই উত্তোলন কওে নিয়ে গেছে।
অপরদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের খাবার পানি ও ওয়াশব্লক নির্মাণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কাজ ছাড়াই বিল উত্তোলনের তথ্য বেড়িয়ে এসেছে। একাধিক সূত্র জানায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লক নির্মাণ ও খাবার পানির নলকূপ স্থাপনের জন্য তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ গুলোতেও নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। বড় অনিয়ম পরিলক্ষীত হয় ভালুকা উপজেলায়, সেখানে ২০২১ সনে ৪টি প্যাকেজে ২০ টি বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মান কাজের কার্যাদেশ প্রদান করেন জয়নব এন্টারপ্রাইজকে, ২০২২ সনের জনু মাসে ৮টি বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লকের বিপরীতে ৮৯ লক্ষ টাকা অগ্রিম বিল উত্তোলন কওে, এরপরেও ওই ঠিকাদার লাপাত্তা।
অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে পানির টাকা জলে যাওয়ার আরেক ভরাবহ দুর্নীতির চিত্র। সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় হালুয়াঘাট উপজেলা ২০টি নলকূপ স্থাপন ছাড়াই বিল প্রদান করে প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০২৪সনের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্যাকেজ নং ৫২৮০ এর অধিনে ২০টি নলকূপ স্থাপনের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। নলকূপ স্থাপন না করেই ঠিকাদার মেসার্স অলি এন্টারপ্রাইজকে ২০২৪ সনের জুন মাসে ১৪ লক্ষ টাকার বিল প্রদান করেন। এক্ষেত্রে নলকূপ স্থাপন না করেই পানি পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন। বিধান রয়েছে আগে নলকূপ স্থাপন হবে, তারপর সেই নলকূপের পানি পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এক্ষেত্রে সেটি মানা হয়নি। ভূয়া রিপোর্ট প্রস্তুত করে প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় হতে তহবিল ছাড় করানো হয়। অদ্যাবধি নলকূপগুলো স্থাপন হয়নি। এছাড়াও জিপিএস-১ প্রকল্পের অধিনে ত্রিশাল উপজেলায় ৬টি বিদ্যালয়ের পানির উৎসের ওয়াশ বেসিন নির্মাণ কাজের বিল প্রদান করা হয়েছে। যার কাজ আজও শেষ হয়নি। আবার একটি কাজকে ২টি প্যাকেজে দেখিয়ে দুইবার দুইজন ঠিকাদারকে বিল প্রদানের রয়েছে অভিযোগ। একই উপজেলার রায়মনি, করুয়াগাছা, ধানীখোলা উত্তরভাটিপাড়া, বাগান, কাশিগঞ্জ ও গোপালপুর এই ৬টি বিদ্যালয়ের ওয়াশ বেসিন নির্মাণ কাজের চুড়ান্ত বিল প্রদান করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে ওয়াশ বেসিনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ভালুকা ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ দীর্ঘদিন ধরে হাফ-ডান অবস্থায় পড়ে আছে।
অপরদিকে হালুয়াঘাট উপজেলার ১নং ভুবকুড়া ইউনিয়নে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২০টি অগভীর নলকূপ স্থাপনের প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই প্রায় ২০ লাখ টাকা বিল উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অনিয়মের সাথে ময়মনসিংহ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জামাল হোসেন, হালুয়াঘাটের সাবেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাজিব আহমেদ, মেকানিক আব্দুল কুদ্দুস, খালিদ, এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স অলি এন্টারপ্রাইজ যুক্ত রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানান। ভুবকুড়া ইউনিয়নের আদিবাসী বাসিন্দা হারুন সাংমা জানান, তিনি ২০২৩ সালে সরকারি ফি জমা দেন। তালিকায় নাম থাকলেও আজ পর্যন্ত নলকূপ পাইনি। আমাদের টাকার কী হয়েছে জানি না। পরিবার নিয়ে চরম পানি কষ্টে আছি। ঝলঝলিয়া হালিমাতুস সাদিয়া (রাঃ) মহিলা কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল জানান, ২০০৩ সালে ১০ হাজার ৫০০ টাকা জমা দিয়েও এখনো কোনো নলকূপ পাইনি। তালিকায় নাম থাকলেও বাস্তবে কাজ নেই। আমার মাদ্রাসার ৩ শতাধিক শিক্ষার্থী নিরাপদ পানির অভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে হালুয়াঘাটের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, বিল উত্তোলন করা হয়েছে, কতটাকা বা কি তা আমি জানি না, সেটা নির্বাহী প্রকৌশলীল এখতিয়ার। তবে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। খুব শিগগিরই কাজ শুরু করব। এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ছামিউল হক বলেন, ২০টি নলকূপ স্থাপন না হওয়ায় ঠিকাদারকে কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া হয়েছে। কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ দিকে নিজের দুর্নীতি আর অনিয়মের কালোসাপের ছোবল থেকে বাঁচতে এবার উদগ্রিব হয়ে উঠেছেন প্রকৌশলী জামাল হোসেন। তিনি শেরপুর থেকে ফিরতে চান আবারও ময়মনসিংহ। কোটি টাকার চুক্তিতে লবিস্ট নিয়োগ করে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন এই কর্মকর্তা। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল হোসেন ২০২১ সনের জানুয়ারীর ৩ তারিখে যোগদান করেন ময়মনসিংহে। অভিযোগ রয়েছে এ যোগদানের পিছনে বৃহৎশক্তি হিসাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বাবু ও ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনের এমপি আনোয়ারুল আবেদীন তুহিন কাজ করেন। তারপরেও অভিযোগ ছিলো, এ যোগদানেও ছিলো বড় অংকের পোস্টিং বাণিজ্য। ফ্যাসিস্টের শক্তি আর দুর্নীতিবাজ এক শ্রেণির ঠিকাদারের প্রিয়ভাজন খ্যাত জামাল হোসেন বেপরোয়া হয়ে উঠেন ময়মনসিংহে। দুর্নীতির চিত্র চাপা দিতে এ দপ্তরের উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষ দুর্নীতির বরপুত্র নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল হোসেনকে ২০২৫ সনের ২৫ ফেব্রুয়ারি শেরপুরে বদলি করেন।
শেরপুরেও দাপটে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। তবে সেখান থেকেও ফিরতে চান বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহে। ২০২৫ সনের ১৭ জুলাই আবারও যোগদান করেন ময়মনসিংহ। কথিত রয়েছে, এ বদলিতেও কোটি টাকার ছিলো হাঁকডাক। তবে এ বদলি হলেও মাত্র ১৩দিনের মধ্যে আবারও ফিরতে হয় তাকে শেরপুরে। ময়মনসিংহ ছাড়তে নারাজ এ কর্মকর্তা। এবার কোটি টাকায় লবিস্ট নিয়োগ করেছেন তিনি। অনুসন্ধানে জানা যায়, ময়মনসিংহে বদলীর জন্য চুক্তিপত্রের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মো. রশিদুল হাসান বাবলুকে লবিস্ট নিয়োগ করেন। ২০২৫সনের ৩ নভেম্বর এ সংক্রান্ত চুক্তিনামাটি ৩০০টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদন করা হয়। এ চুক্তিনামায় বদলী সংক্রান্ত বিষয়ে তদবির করার জন্য লবিস্ট নিয়োগের দেন নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল হোসেন। স্ট্যাম্প নম্বর- গজ ২৮৬৮৩৭২, গজ ২৮৬৮৩৭৩ ও গজ ২৮৬৮৩৭৪’তে রয়েছে তার স্বাক্ষরও। এ চুক্তিনামায় ৫৫ লক্ষ টাকা কন্সালটেন্সি ফি নির্ধারণ করা হয়। ২০২৫সনের ১৬ নভেম্বর সাদা কাগজে বদলীর শর্ত সমূহ উল্লেখ্য করে এ কাজে সম্পৃক্ত করা হয় মো. রশিদুল হাসান বাবলু, হালুয়াঘাট উপজেলার গোলাম মোস্তফাকেও। সেই চুক্তির নামার পরিবর্তে তারা ব্যাংকের চেক নেন। এরমধ্যে রয়েছে উত্তরা ব্যাংক কুড়িগ্রাম শাখার হিসাব নং ০০১২২০০০২১৭৭৬ এর টাকার পরিমান ৭ লক্ষ টাকার একটি চেক, অগ্রনী ব্যাংক ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ শাখার হিসাব নং ০২০০০১৭০৩০৩০৪ এর ৪৩ লক্ষ টাকার একটি চেক, জনতা ব্যাংক নবাব আব্দুল গনি রোড শাখার হিসাব নং ০১০০২৭৭৭৯৭২৪৫৪ এর ১০ লক্ষ টাকার একটি চেক এবং ডাচ বাংলা ব্যাংকের হিসাব নং ১৬৪১৫১০০১০৩৬৭ এর ৮০ লক্ষ টাকার একটি চেক। চারটি চেকে লবিস্টদেরকে ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা দেয়ার চুক্তি হয়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক ময়মনসিংহ জেলায় বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর দরপত্র আহবান হতে মাঠ পর্যায়ে কাজ বাস্তবায়ন প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষন করা হলে এর আসল চিত্র বেরিয়ে আসবে। ময়মনসিংহ জেলার জনস্বাস্থ্য অফিসে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে পত্র প্রদান করা হয়েছে এবং কাজ শতভাগ সম্পন্ন না করে আর কোন বিল প্রদান করা হবে না। জানা যায় এই ধরনের সমস্যা হালুয়াঘাট উপজেলা ছাড়া ত্রিশাল ও মুক্তাগাছা উপজেলাতেই বেশি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এর দায় এড়াতে পারেনা। এ অবস্থা চলতে থাকলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সুদূর পরাহত হবে।
এ দিকে নান্দাইলের পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আধুনিক শৌচাগার (ওয়াশ ব্লক) নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি গত প্রায় চার বছরেও। এতে হাত ধোয়া, শৌচাগার ব্যবহার ও বিশুদ্ধ পানি পানে ভোগান্তিতে পড়েছে এসব বিদ্যালয়ের প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী। নির্মাণকাজে ঠিকাদারের ধীরগতি এবং উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের গাফিলতি ও তদারকির অভাবে এসব বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কাজ শেষ হচ্ছে না বলে অভিযোগ বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে ২০২১-২২ অর্থবছরে নান্দাইল উপজেলার ১৭৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আধুনিক শৌচাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৩) আওতায় এই প্রকল্প পরিচালিত হয়। এর মধ্যে উপজেলার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের কুরাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গাংগাইল ইউনিয়নের সুরাশ্রম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেতাগৈর ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজগাতী ইউনিয়নের বড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের মধ্য ডেউলডাংরা ভূঁইয়া স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে। এই পাঁচটি বিদ্যালয়ে শৌচাগারের জন্য ব্যয় ধরা হয় ৭৫ লাখ টাকা। সূত্র জানায়, নির্মাণ কাজের ঠিকাদারি দেওয়া হয়েছিল রাজধানীর কদমতলী থানার মেরাজনগর এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবদুল্লাহ অ্যান্ড অয়ন এন্টারপ্রাইজকে। ২০২১ সালে ১৯ এপ্রিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। কার্যাদেশ পেয়ে পাঁচটি বিদ্যালয়ে শৌচাগার নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। একপর্যায়ে কাজ অর্ধেক সম্পন্ন করে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের পর থেকে ঠিকাদার উধাও হয়ে যান। সেই থেকে ভোগান্তিতে রয়েছে পাঁচটি বিদ্যালয়ের এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাজের ৪০ শতাংশ বিল ইতোমধ্যে তুলে নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সরেজমিনে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মূল ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত করে শৌচাগারের কংক্রিটের কাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। কাঠামোর মধ্যে ইটের গাঁথুনি নির্মাণ করে ফেলে রাখা হয়েছে। ইট-বালুসহ অন্যান্য নির্মাণ উপকরণ বিদ্যালয়ের মাঠে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। বিদ্যালয়ের পুরনো শৌচাগারগুলো ব্যবহার অনুপযোগী। কয়েকটি বিদ্যালয়ে সুপেয় পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। স্থানীয়রা জানায়, বিদ্যালয়ে পড়তে এসে শিক্ষার্থীরা খুবই ভোগান্তি পোহাচ্ছে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে অনেককেই আশপাশের বাসিন্দাদের বাড়িতে যেতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকরা জানান, বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয় তাঁদের কথায় কর্ণপাত করছে না। এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানেরর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন রাজু আহম্মেদ বলেন, ৩০ লাখ টাকা পাওয়ার পর আর টাকা পাননি। তাই নিজের প্রয়োজনয়ি অর্থ না থাকায় কাজ শুরু করতে পারছেন না। টাকা পেলেই কাজ শুরু করতে পারবেন।জানতে চাইলে নান্দাইল উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রেবেকা ইয়াসমিন বলেন, আমি অনেকবার চিঠি দিয়েছি কাজ শুরু করার জন্য। কিন্তু ঠিকাদার কেন কাজ ধরছেন না, তা বুঝতে পারছি না।
এ প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী সামিউল ইসলাম জানান, তিনি নতুন যোগ দিয়েছেন। যতটুকু জানতে পেরেছেন, এর আগে একাধিকবার ঠিকাদারকে ফোন ও চিঠি চালাচালি করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। এখন ওই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধিনে যে সকল প্রকল্পের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যাবে, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে পরামর্শক্রমে এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।