ঢাকা | 16 August 2026

জন্মান্ধ জহু ফকিরের চেম্বার

বিশেষ প্রতিবেদক, .
নিউজ প্রকাশের তারিখ :Aug 16, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: ছবির ক্যাপশন:
ad728
জয়নাল আবেদীন
মানিক গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ভিখু। ভিক্ষুক হলেও সে অসহায় ছিল না। নিদারুণ দৈহিক ক্ষুধা, লোভ, কামনাসহ প্রচণ্ড আদিম সুলভ প্রবৃত্তি ছিল তার। 'প্রাগৈতিহাসিক' গল্পের নায়ক সেই ভিখুর মতোই আরেক দুর্দান্ত ভিখুর সন্ধান মিলেছে টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌর শহরে। ষাটের দশকের গল্পের ভিখু আর আজকের জীবনসংগ্রামে আমাদের আজকের ভিখু জন্মান্ধ হলেও জীবনের কাছে হেরে যাওয়ার নয়। নিজস্ব স্টাইলের লড়াইয়ে জীবনের কঠিন চাকা ৫৫ বছর অতিক্রম করেছেন। আজকের ভিখুর নাম জহু ওরফে ভিখু জহু।

জহু ভিখু আর ১০ জন ভিক্ষুকের মতো নন। নিজেকে অসহায়ভাবে উপস্থাপন করে সব সময় অন্যের সহানুভূতি কাড়ার কৌশল এড়িয়ে চলেন সাবধানে। আত্মবিশ্বাসে ভর করে জীবিকার যুদ্ধ চালান। জহুর বাবা মৃত কৈশোরে টাইফয়েডে দুই চোখের আলো নিভে যায়। দিনমজুর বাবা ছেলেকে কুরআনের হাফেজ বানাতে খরুরিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করেন। ১০ কায়দা সিপারা মুখস্থের পর পেটের তাগিদে পড়া ছেড়ে বাস স্ট্যান্ড মসজিদের মুয়াজ্জিন হয়। মুয়াজ্জিন কাজের বাইরে মসজিদ ও বাথরুম ধোঁয়ামোছার বাড়তি চাপে চাকরি ছাড়েন।

এরপর নিজের পায়ে দাঁড়াতে শহরে ফেরি করে চকোলেট বেচায় নামেন। অন্ধ বিবেচনায় অনেকেই চকোলেট নিত। কিন্তু একপর্যায়ে এক চকোলেটের দাম দিয়ে ১০ চকোলেট হাতিয়ে নেওয়ায় লোকসান যায়। ফলে এটি বাদ দিয়ে অলিগলিতে ঘুরে মোবাইলে ফ্লেক্সিলোড দেওয়ার কাজে নামেন। অন্ধ হলেও বাটন সেটের কিবোর্ড বিশেষ কায়দায় টিপে গ্রাহককে লোড দিতেন। কিন্তু এখানেও ঠকবাজের পাল্লায় পড়েন। দুষ্ট লোকেরা লোডের বিপরীতে ছোট, ছেঁড়া এমনকি জাল নোট দিয়ে অথবা টাকা না দিয়েই কৌশলে কেটে পড়ায় সে ব্যবসা ছাড়তে হয়।

শত দারিদ্র্যের মধ্যেও আমাদের ভিখুর প্রেম-ভালোবাসা থেমে থাকেনি। নগরে মাগনে নেমে যুবতি  সাবিনার সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে। তিন বছর পর ছাড়াছাড়ি। দ্বিতীয় দফায় ভিখারি হাসনার সঙ্গে প্রণয় ও বিয়ে এবং এক সন্তানের জনক হওয়া। সে ঘরও ভেঙে যায়। অতঃপর দীর্ঘ দিন প্রণয়ের পর তৃতীয় বিয়ে রওশন আরাকে। এ পক্ষে দুই মেয়ে। তবে মাকে তালাক দেওয়ার ক্ষোভে ছেলে ভ্যানচালক নাজমুল জহু ভিখুকে খরপোষ দেয় না। দুই দফা ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পর ভিখু জহু বুঝতে পারে অন্ধ মানুষের নিজের পায়ে দাঁড়ানো খুবই কষ্টকর। তাই বাটি হাতে মাগনে নামেন। পৌর শহরকে বিভক্ত করা বৈরাণ নদের ব্রিজের গোড়ায় টুল পেতে সারাক্ষণ গজল গাইতেন। মোলায়েম কণ্ঠস্বরে মুগ্ধ হয়ে পথচারীরা টাকাপয়সা দিত। স্থানীয় সংবাদকর্মী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বছর চারেক আগে জহু ভিখু পাঁচ বাই ছয় ফুট সাইজের চাল যুক্ত স্টিলের চেম্বার বানান। সেটি শক্ত রড ও অ্যাঙ্গেল দিয়ে বৈরাণ ব্রিজের রেলিংয়ের সঙ্গে আটকে দেন। নদীর অংশে ঝোলায়মান টং ঘরের নাম দেন কুঁড়েঘর। কিন্তু মানুষ একে বলে জহু'স চেম্বার। চেম্বারে লোহার দানবাক্স, বসার চেয়ার এবং অডিও ক্যাসেট ও মাইক্রোফোন রয়েছে। জহু চেম্বার ছেড়ে কোথাও গেলে চেয়ারে রাখা ক্যাসেটের এলান হ্যান্ড মাইকে উচ্চস্বরে প্রচার হতে থাকে। কোনো ধরনের দানখয়রাতে সওয়াব বেশি সেটির বয়ান থাকে। বিকাশে দানের ফজিলত বেশি বলে প্রচারিত হয় এবং একাধিকবার বিকাশ নাম্বার ঘোষিত হয়। জহু ভিখু জানান, শিক্ষিত ও ঠাটবাট বজায় রাখা মানুষরাই বেশি ঠগ। জীবনে বহুভাবে এদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছি। ভিখারিকে যারা ঠকায় তারা মিসকিন। মিসকিনদের সে খুব ঘৃণা কবে। জহু মাগন করে চার শতাংশের বাড়ি ভিটে ও টিনের ঘর করেছেন । দানবাক্সে এবং বিকাশে মাসে হাজার পাচেক টাকা আয় হয়। উপজেলা ভিক্ষুক সমিতির সভাপতি হিসেবে তিনি জানান , দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে বা কাজকর্ম কমে গেলে ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে যায়।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ