রাজধানীতে উন্মুক্ত কিছু মাঠ থাকলেও সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী। আসাদ গেটের পশ্চিমে অবস্থিত লালমাটিয়া নিউ কলোনি ক্রীড়া চক্র মাঠটি দীর্ঘকাল ধরে দখল ও দূষণের কারণে সম্পূর্ণ খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মাঠটিতে ঘাসের কোনো অস্তিত্ব নেই। এর চারপাশ কাঁচাবাজার, ভ্রাম্যমাণ দোকান এবং ভবন নির্মাণসামগ্রীর ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। অবৈধ মেলা ও গাড়ি বিক্রির হাট বসায় শিশু-কিশোররা মাঠে খেলাধুলার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের জন্য ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা (খেলার মাঠ, পার্ক ইত্যাদি) প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় জনপ্রতি খোলা জায়গার পরিমাণ এক বর্গমিটারের কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থীর গবেষণা অনুযায়ী, খোলা জায়গার সংকট সবচেয়ে বেশি পুরান ঢাকায়। ঐ এলাকার আটটি ওয়ার্ডে একটুও উন্মুক্ত স্থান নেই।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বেসরকারি বিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মানের খেলার মাঠ বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে কাজ চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল হালিম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ থাকা খুবই জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। তিনি বলেন, সুস্থ দেহ, সুস্থ মন। সেজন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য থাকতে হবে খেলাধুলার সুযোগ, উন্মুক্ত মাঠ।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, একটি আধুনিক শহরে প্রতি আধাবর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি খেলার মাঠ থাকা আবশ্যক। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আয়তন (৩০৫ দশমিক ৪৭ বর্গকিলোমিটার) অনুযায়ী মাঠ প্রয়োজন অন্তত ৬১০টি। অথচ বাস্তবে আছে মাত্র ২৩৫টি! অর্থাত্ প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক মাঠও নেই। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের একটি বড় অংশ মোবাইল, টেলিভিশন, ট্যাব বা কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের পর্দায় চোখ রেখে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কাটায়। এর ফলে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে, মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আদনান হোসেন। বর্তমানে ২০ বছরের টগবগে তরুণ। রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছে সে। তার ১০ বছরের স্কুলজীবনে প্রতিদিন সকাল শুরু হয়েছিল পড়াশোনা দিয়ে, বিকালও শেষ হতো পড়াশোনায়। তারপর সোজা বাসায়। সেখানেও কেবল পড়া আর পড়া। পরদিন আবার সেই একই রুটিন। চার দেওয়ালের গণ্ডির ভেতরে এভাবেই কেটেছে আদনানের স্কুলজীবনের ১০টা বছর। খেলাধুলায় তার সমবয়সি অন্যদের অর্জনের ঝুলিতে থানা, জেলা, বিভাগীয় বা জাতীয় পুরস্কার থাকলেও আদনানের নেই কিছুই। শুধু যে আদনানের অর্জনের ঝুলি খালি, তা কিন্তু নয়। আদনানের মতো অসংখ্য শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের বিদ্যালয় জীবন কেটেছে এমনই মলিন। কেননা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের জন্য ছিল না কোনো খেলার মাঠ।