শোভন দাস
টাঙ্গাইল শহরে শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যান, ছয় আনী পুকুর পাড়সহ অনেক জায়গায় পৌষ মাসে রকমারি শীতের পিঠার ঘ্রাণে মোহিত হচ্ছে মানুষ। শীতের পিঠা বানিয়ে অনেকের ভাগ্য বদলও হয়েছে। আবার শীতের পিঠার স্বাদ নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে অনেকে। প্রতি বছর শহরের এসব জায়গায় জমে উঠে পিঠা বিক্রি। চিতই পিঠা, ভাঁপা পিঠা, পাটিসাপটা ও তেলের পিঠার মিষ্টি ঘ্রাণে মোহিত হয়ে ওঠে এসব এলাকা। কুয়াশা মুড়ানো শীতের হিমেল হাওয়ায় ধোঁয়া উঠা ভাঁপা-চিতই পিঠার স্বাদ না নিলে যেন, তৃপ্তি মিটে না শীতকালীন পিঠা ভোজনরসিকদের।
প্রতিদিন বিকেল হলেই সারিবদ্ধ চুলার অল্প আঁচে পিঠা তৈরির ধোঁয়া উড়ছে। গরম গরম চিতই পিঠা, ভাঁপা পিঠা, তেলের পিঠা নামানো হচ্ছে। ক্রেতারা এসে সারিবদ্ধ হয়ে পিঠা কিনে খাচ্ছেন-এমন দৃশ্য চলে রাত পর্যন্ত। শহরের যান্ত্রিক জীবনে অনেকের সময় নেই বাড়িতে পিঠা তৈরি করার। তাই এসব দোকানে পিঠা কিনে খেতে ভীড় করেন অনেকেই। শীতের পিঠার স্বাদ নিতে দোকানগুলোতে বেড়েছে পিঠা বেচা-কেনার।
এসব পিঠা বিক্রি করে অনেকে হয়েছেন স্বাবলম্বী। পেয়েছেন আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ। নারীরা সংসারে অর্থ যোগান দিতে বেছে নিয়েছেন পিঠা তৈরির কাজ।
৬০ বছর বয়সের রিনা বেগম। তার স্বামী আইয়ুব আলীসহ পৌর উদ্যানে পিঠা তৈরি ও বিক্রি করেন। প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টাকার পিঠা বিক্রি করেন। পিঠা তৈরির খরচ বাদে যা থাকে তা দিয়ে ভালভাবে চলে পরিবার। তিনি বলেন, শীতের মৌসুমে পিঠে বেচা কিনা ভালই হয়।রেজিষ্ট্রিপাড়া এলাকা থেকে পিঠা কিনতে আসা সুমি আক্তার জানান, বাসায় গ্যাসের চুলায় পিঠা ভালো হয় না। এরজন্য এখান থেকে পিঠা কিনে নিয়ে যাচ্ছি, বাসায় পরিবারসহ খাবো।ক্রেতা শামীম বলেন, শীতের কারণে এখান থেকে পিঠা কিনে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পরিবারের সকলে একসাথে খাওয়া হবে। আমার মত গ্রাহক সংখ্যা শীতের কারণে বাড়ছে।
সমবায় মার্কেটের ব্যবসায়ী সাদিকুল ইসলাম বলেন, আমি প্রতিদিনই পিঠা খেতে আসি। মাঝে মাঝে আমার বন্ধুদেরকে নিয়ে পিঠা খাওয়ার আড্ডায় বসি।এখানে পিঠা বিক্রেতা শুধু রিনা বেগম নয়, শাহিদা আক্তার, শরীফা বেগম ও আমিনাসহ অনেকে শহরের বিভিন্ন জায়গায় পিঠার দোকান করেন।পিঠা বিক্রেতা গৃহবধূ শাহিদা আক্তার জানান, তার স্বামী রিক্সা চালায়। শীতে রিক্সা চালাতে অনেক কষ্ট ও উপার্জন কম হয়। তাই দুজন মিলে এখানে পিঠা তৈরির দোকান দিয়েছেন। প্রতি দিন তারা প্রায় চার হাজার টাকার পিঠা বিক্রি করেন। এতে তাদের পরিবার ভালো চলছে বলে দাবি করেন।
পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার পিঠা বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ৬ বছর যাবত এখানে পিঠা বিক্রি করে আসছি। প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে এখানে এসে পিঠার দোকান দেই। গভীর রাত পর্যন্ত পিঠা বিক্রি করে বাসায় চলে যাই। প্রতিদিন ৪-৫ হাজার টাকার পিঠা বিক্রি হয়। লাভ মোটামুটি ভালোই থাকে। আগে এখানে আমার একটাই পিঠার দোকান ছিল। আমার দেখা-দেখি অনেকে পিঠার দোকান দিয়েছে। এটা সরকারি জায়গা। দোকান দেওয়া নিয়ে কাউকে মানা করা যাবেনা। যার পিঠা ভালো হবে, তারটাই মানুষ খাবে। আমার অনেক বান্ধা কাস্টমার আছে। যারা অর্ডার দিয়ে বেশি করে পিঠা নিয়া যায়।
অল্প পুঁজিতে বেশি লাভ হওয়ায় অনেকেই এ শীতের পিঠা বিক্রিকে বেছে নিয়েছেন মৌসুমী পেশা হিসেবে। শীতকালের খাবার মধ্যে পিঠা অন্যতম। আগে যদিও বাড়িতে এসব পিঠা বানানোর হিড়িক পড়তো, এখন তা আর দেখা যায় না।শুধু শহরের পৌর উদ্যান নয়, ছয় আনী পুকুর পাড়, নিরালা মোড়, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের সামনে, নতুন বাসস্ট্যান্ড, ডিস্ট্রিক গেইটসহ বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট পিঠার দোকান সাজিয়ে বসছে নারী-পুরুষ বিক্রেতারা।
প্রতিটি ভাঁপাপিঠা, চিতাই ও তেলের পিঠা বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়। তবে, ঝাল, ধনে বাটা অথবা সরিষা বাটা থাকছে ফ্রি। এর মধ্যে ভাঁপা আর চিতই পিঠার কদর বেশি। সব বয়সের মানুষ আসেন দোকানে পিঠা খেতে। অনেকে বাসায় নিয়ে যান। এসব রকমারি পিঠা খেতে সুস্বাদু হওয়ায়, শীতের এ মৌসুমে সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।