টাঙ্গাইলের মধুপুরে একটি বেসরকারি চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রে চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় সালমা বেগম (৩২) নামের প্রসূতি মায়ের মৃত্যু ঘটেছে। সিজারিয়ান অপারেশনে জন্ম নেওয়া কন্যাশিশু সুস্থ্য থাকলেও মায়ের অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ময়মনসিংহের বিভিন্ন ক্লিনিকে স্থানান্তর করার পর তার মৃত্যু হয়। রোববার সন্ধ্যায় রোগির স্বজনরা হতভাগা সালমার মরদেহ এনে চিকিৎসকের বিচার ও মধুপুরের ডক্টরস ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়ার দাবি তোলেন। ভুল চিকিৎসায় মারা যাওয়া সালমা বেগম জেলার মধুপুর উপজেলার কুড়ালিয়া ইউনিয়নের টিকরী গ্রামের আব্দুল কাইয়ুমের স্ত্রী। তাদের সংসারের এক ছেলে এক মেয়ে বুঝে উঠার আগে মাহারা হলেন। এই ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভ, দু:খ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সালমার বড় ভাই হাসান জানান, শুক্রবার ১৮ এপ্রিল নিয়মিত চেকাপের অংশ হিসেবে তার বোন গর্ভবর্তী সালমাকে নিয়ে আসা হয় মধুপুরের ডক্টরস ক্লিনিক এন্ড হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসক হামিদা বেগমকে দেখানোর পর সিজারিয়ান অপারেশন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা ও অপারেশনের ফি ১৭ হাজার টাকা চুক্তিতে সালমাকে ভর্তি করা হয়। এরপর শুরু হয় পরীক্ষা নিরীক্ষা। রাত দশটার পরে সালমার সিজার করেন গাইনী বিভাগের চিকিৎসক হামিদা বেগম। আর অজ্ঞানের চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করেন খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার চিকিৎসক তারিকুল ইসলামে তারেক। অপারেশনের আগে সম্পূর্ণ সুস্থ্য ছিল সালমা। কিন্তু অপারেশনের পর থেকেই বিপি কমে যাচ্ছিল। পরে তাকে রক্ত দেওয়া হয়। শনিবার সকালে তার অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে পাঠানো হয় ময়মনসিংহের বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র পিপলস হাসপাতালে। এই হাসপাতালটি সিজারিয়ান অপারেশনকারী চিকিৎসক হামিদা বেগমের স্বামী আনোয়ার হোসেনের। সেখানে তেমন কোন চিকিৎসা না পাওয়া তাকে নেওয়া ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে ক্লিনিকের লোকজন পুনরায় সালমাকে সায়েম ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে অবস্থার আরও অবনতি হলে আইসিইউতে রাখা হয় রোগিকে। রোববার ভোররাতে তার মৃত্যু হয়। হাসান আরও জানান, সালমার অপারেশনে ত্রুটি হয়েছে এই বিষয়টি অন্য ক্লিনিকের লোকজন তাদের নিশ্চিত করেছেন। অপরদিকে অপারেশনের পর থেকে দুই দিনে মৃত্যুর আগপর্যন্ত এক ফোটা ইউরিনও তার শরীর থেকে নির্গত হয়নি। অনেক কষ্টে আমার বোনের মৃত্যু হয়েছে। সালমার স্বামী আব্দুল কাইয়ুম বলেন, আমার স্ত্রী সম্পূর্ণ সুস্থ্য ছিল। তাকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি সালমার হত্যাকারি চিকিৎসক হামিদা ও ক্লিনিক মালিকের শাস্তি দাবি করছি এবং ক্লিনিক সীলগালা করার দাবি জানাচ্ছি। যাতে করে ভুল চিকিৎসায় বা ডাক্তারের অবহেলায় আর কোন মানুষের মৃত্যু না ঘটে। এদিকে ডক্টরস ক্লিনিকের ব্যবস্থাপক শাকিল নেওয়াজ বলেন, ভুল চিকিৎসায় রোগির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে আমি যতটুকু জেনেছি, রোগির কিডনী ও হার্ট ফেল করায় তার মৃত্যু হয়েছে। এদিকে সালমার আরেক ভাই ডা. আমিনুর রহমান বলেন, সুস্থ্য মানুষ অপারেশনের পর একই সাথে কিডনী ও হার্ট ফেল করবে এমন হওয়ার সুযোগ নেই। অপারেশনের পর যে কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। কিডনী, হার্ট ফেল করার কথা বলা মানে তাদের বড় একটা ভুল ঢেকে যাওয়ার অপচেষ্টা মাত্র। এব্যাপারে চিকিৎসক হামিদা বেগম বলেন, রোগীর অপারেশনের পর প্রেসার কমায় অবস্থার অবনতি ঘটে। এদিকে তার ইউর বন্ধ হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এবং কিডনিতে ত্রুটি ধরা পড়ায় তার মৃত্যু হয়। এনেস্থেসিয়ার ডা. তারিকুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মধুপুরের ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি খুররম খান ইউসুফজি প্রিন্স বলেন, রোগির মারা যাওয়ার পেছনে ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা বা ডাক্তারের ত্রুটি আছে। রোগির মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা সালমার রেখে যাওয়া সন্তানদের সুচিকিৎসা ও ভরপোষণের ব্যবস্থা করবো এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। উল্লেখ্য, অপারেশনের সময় এনেস্থেশিয়ার দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক তারিকুল ইসলাম তারেক মিথ্যা অজুহাতে কর্মস্থল ফাঁকি দিয়ে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন টাকার বিনিময়ে। হাম-রুবেলার পরিস্থিতির কারণে সকল চিকিৎসক, নার্সসহ চিকিৎসা সেবা জড়িতদের সকল ছুটি বন্ধ করেছে সরকার। সেই সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ডা. তারেক মাসের পর মাস খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার দায়িত্ব ফাঁকি দিয়ে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন ক্লিনিকে দায়িত্ব পালন করছেন।